দর্শনা অফিস: দর্শনায় উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের অনিয়ম দুর্নীতি তদন্তে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ভবন পরিদর্শন করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিনিধিদল। দুদক কুষ্টিয়ার উপপরিচালক আব্দুল গাফফারের নের্তৃত্বে ৬ সদস্যের এ প্রতিনিধি দলের সাথে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ কৃষি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দুদকের প্রতিনিধি দল দর্শনা পৌর মেয়র মতিয়ার রহমানসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলেছেন। ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ভেঙে দেখেছেন তারা। দুদকের প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে পৌঁছুনোর পরপরই দর্শনা পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফরিদুর রহমান, জেলা ও উপজেলা কৃষি অফিসারসহ স্থানীয়দের সাথে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়।
প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন চুয়াডাঙ্গা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য অধিদয়তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান, গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মাসুম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নির্মল কুমার দে, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফরিদুর রহমান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুফি রফিকুজ্জামান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন, সংশ্লিষ্ট মামলার বাদী মেরিনা জেবুন্নাহার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ঢাকা খামার বাড়ির প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, বেনাপোল বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কর্মকর্তা ওয়াজেদ মিয়া, দর্শনা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তা কামরুন্নাহার মিতা, সুধি সমাজের সুধির কুমার শান্তারা, সাহিত্যিক আবু সুফিয়ান প্রমুখ।
এদিকে গত ৬ এপ্রিল শুক্রবার এ ভবন নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ঢাকার ফার্মগেট মনিপুরীপাড়ার মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনালের সত্বাধীকারী মনি সিংকে গ্রেফতার করেছে দুদক ও ৱ্যাব। বর্তমানে তিনি জেল-হাজতে রয়েছেন। ১১ এপ্রিল দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাহমুদুল হক পাটোয়ারীর নেতৃত্বে পরিদর্শনকারীদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যুলেয়শন অফিসার মেরিনা জেবুন্নাহার বাদী হয়ে সংশিলষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটার মনি সিং (৬৪/এ মনিপুরী পাড়া তেজগাঁও ঢাকা), ইঞ্জিনিয়ার্স কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের (ইসিএল) ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মো. আবদুস সাত্তার (৮৭০ শেওড়া পাড়া মিরপুর ঢাকা) এবং প্রকল্পের ক্রয় বিশেষজ্ঞ আয়ুব হোসেন (ফ্লাট-২/৫২ তেজকুনিপাড়া তেজগাঁও ঢাকা) এই ৩ জনের বিরুদ্ধে দামুড়হুদা মডেল থানায় ১১ এপ্রিল সোমবার রাত ৮টার দিকে মামলা দায়ের করেছেন। এর আগে এ দুর্নীতি ও অনিয়নের ঘটনার পর্যায়ক্রমে সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল বেলা ১১টায় কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের কমিটির তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাভূক্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ ফাইটোসেনেটারী ক্যাপাসিটি শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের অধীনে উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র, স্থলবন্দর, দর্শনায় চুয়াডাঙ্গা অফিস ভবন নির্মাণ কল্পে গত বছরের ১২ জুলাই ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সমূহের দরপত্র মূল্যায়ন করে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনাল ৬৪/এ মনিপুরী পাড়া তেজগাঁও ঢাকা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছিলো। প্রকল্প পরিচালকের স্মারক নং-ফাইটো-৪১/২০১৫ (অংশ)/৭৮৪ তারিখ ২৫/১০/২০১৫ মোতাবেক মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয় (পরিশিষ্ট-১)। কাজের চুক্তিমূল্য ধার্য হয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ২২৭ টাকা ২২ পয়সা। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত মতে চুক্তি সম্পাদনের দিন থেকে ১২ মাসের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিলো। এ নির্মাণ কাজের ডিজাইন, স্থাপত্য নকশা, কাঠামোগত ডিজাইন তৈরি ও নির্মাণ চলাকালীন সকল প্রকার কাজের গুণগতমান নিশ্চিত করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স কনসোর্টিয়াম লি. (ইসিএল) ৮৭০ শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ নিয়মপদ্ধতি অনুসরণ করে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিলো। সেই সাথে প্রকল্পের সকল প্রকার ক্রয় কার্যক্রমে প্রকল্প পরিচালককে সহায়তা করার জন্য আয়ূব হোসেনকে এই প্রকল্পের ক্রয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। কৃষি সম্প্রারণ অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও আইসিটি ব্যবস্থাপনা শাখার পক্ষ থেকে এ নির্মাণ কাজটি দেখভালের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেনকে। নির্মাণ কাজটি গত বছরের ৫ নভেম্বর শুরু হয়। রাতের আঁধারেই ইতোমধ্যেই নির্মাণ কাজের মূল ভবনসহ ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে গত ৬ এপ্রিল নির্মাণাধীণ ভবনের সম্মুখ অংশে ডিজাইন উপেক্ষা করে অনুমোদিত রডের পরিবর্তে বাঁশের কাবারী ও ইটের খোয়ার পরিবর্তে সুরকি ব্যবহারের বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে পড়লে দেশের প্রায় সবকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশ করা হয়। ঘটনাটি সারাদেশে তোলপাড় সৃস্টি হয়। সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বারবার করেছেন পরিদর্শন। গঠন করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি। এরই মধ্যে ভবনটির চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছে। সে সময় নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা।