শবে বরাতের তাৎপর্য ও আমাদের করণীয় -মুফতি মুস্তাফা কামাল কাসেমী

 

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় শবে বরাতের গুরুত্ব আমাদের নিকট একেবারে কম নয়। সমাজে সাধারণত শাবান মাস আগমনের ফলে মুসলিম তৌহিদি জনতার অন্তরে রমজানের আগ্রহ-উদ্দীপনা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায়। কেননা আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহই হলো মুমিনের মৌলিক উদ্দেশ্য। রমজানের পূর্বের মাসের নাম শাবান মাস। এ মাসের ১৪ তম রজনীকে শবে বরাত বলা হয়। প্রথমে আমরা জানতে চেষ্টা করবো শবে বরাতের অর্থ কী? ফারসি ভাষায় শব শব্দের অর্থ রাত আর বরাত শব্দের অর্থ মুক্তি। তাহলে শবে বরাতের অর্থ দাঁড়ালো মুক্তির রজনী অর্থাৎ মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে পাপ পঙ্কিলতা হওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক। সেই পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি প্রাপ্তির জন্য আল্লাহতায়ালা কিছু কিছু সময়, রাত ইত্যাদি নির্বাচন করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো শবে বরাত। যখন শাবান মাসের অর্ধেক অর্থাৎ ১৪তম দিন পেরিয়ে রাতের আগমন ঘটে তখন আল্লাহতায়ালা প্রথম আসমানে আগমন করে ডাকতে থাকেন। কে আছো গুনাগার আমি তার গুনা মাফ করে দেবো, কে আছো অভাবগ্রস্ত আমি তার অভাব দূর করে দেবো, কে আছো রোগাক্রান্ত আমি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দেবো। এই বলে বলে তিনি সুবেহ সাদেক পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, যখন ১৪ শাবানের রাত আগমন করে তখন তোমরা রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত করো ও দিনের বেলায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রোজা রাখো। এ হাদিসটি সুনানে ইবনে মাজা শরিফের ১৩৮৮ নং হাদিসে বর্ণিত আছে। অনেকে ওই হাদিসকে মওজু বলে থাকেন। এটা নিছক ভ্রান্ত ধারণা এছাড়াও মুসনাদে আহম্মদ ইবনে হাম্বলগ্রন্থে ৬৬৪২ নং হাদিসে হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করিম (সা.) বলেছেন, অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন অতঃপর শিরক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত সমগ্র সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন। এ ব্যতীত মুসনাদে বায্যার গ্রন্থের ২০৪৫নং হাদিসে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর ওই বিবরণ পাওয়া যায়। মোটকথা আমরা যখন ইসলামের কোনো বিধানের বিষয়ে মন্তব্য করি, সে বিষয়ের প্রতি অগাধ জ্ঞান ও বুৎপত্তি অর্জন না হওয়ায় অনেক সময় অনেক মন্তব্য করে থাকি। যা নিছক বোকামি বৈ কিছুই নয়। ‘শবে বরাত উপলক্ষে ইবাদত করা যাবে না করলে এটা বেদায়াত হবে। কোনো হাদিসে এ রাতে ইবাদত করার ব্যপারে উল্লেখ নেই।’ এ ধরনের অহেতুক হাজারো মন্তব্য আমাদের। তাহলে আমরা এর সমাধান পেতে আরেকটু অগ্রসর হই। হযরত আলা ইবনুল হারিস (রহ.) থেকে বর্ণিত হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রসুল্লাহ (স.) আমার পাশে শুয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নামাজে দাঁড়ালেন এবং এতো লম্বা সেজদাহ করলেন যে, আমার আশঙ্কা হতে ছিলো যে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন তাই আমি উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গলি নাড়া দিলাম। সিজদাহ থেকে মাথা উঠিয়ে নামাজ শেষ করে তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা তুমি কি জানো? এটা কোন রাত? সিদ্দিকা (রা.) বললেন না, রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন এটা শাবান মাসের ১৪তম রজনী। আল্লাহতায়ালা এ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। বায়হাকি শরিফে ৩ নং খণ্ড ৩৮২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে। এ হাদিসকে ইমাম বায়হাকি হাসান বলেছেন। শাবান মাসের ১৪তম রজনীতে ইবাদত করা প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত বিবরণ, মা-ছাবাতা বিসছুন্নাহ গ্রন্থে বর্ণিত আছে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, এক রাতে নবী করিম (সা.) আমার ঘরে আগমন করে গায়ের জামা খুললেন আবার কিছুক্ষণ পর পরিধান করে বাইরে চলে গেলেন। ওই কাজটি আমার আত্মমর্যাদা বোধে আঘাত হানলো। আমি ভাবলাম হয়তো বা তিনি আমার অন্য সতীনদের কাছে রাত যাপন করবেন বলে বেরিয়ে গেলেন। আমি খুঁজতে বের হলাম অবশেষে না বেয়ে নিরুপায় হয়ে জান্নাতুল বাকিতে প্রবেশ করলাম। অবশেষে দেখলাম তিনি কবরবাসীদের জন্য দোয়া করছেন। তাহলে মোটামুটিভাবে শাবান মাসের ১৪তম রজনীতে ৬টি আমল আমরা করতে পারি। ১. রাত জাগরণ করা অর্থাৎ রাতে এমনভাবে নামাজ তেলওয়াত, জিকির, মুরাকাবা করা, যাতে কোনো সময় আল্লাহর জিকির বা স্মরণ থেকে অন্তর গাফেল না হয়। ২. পরের দিন আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নফল রোজা রাখা, ৩. আল্লাহতায়ালার নিকট গুনাহ মাফ হওয়ার জন্য বিনয়ের সাথে কান্নাকাটি করা, ৪. কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তিদের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা। মনে রাখতে হবে কবরস্থানে দলবদ্ধভাবে না গিয়ে একা একা গিয়ে দোয়া করা, ৫. মুমিন নর-নারী যারা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন, তাদের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা, ৬. ওই রাত যেহেতু ইবাদত ও ফজিলতের রাত সেহেতু পাক পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করা। ফুকাহায়ে কেরাম ওই গোসলকে মুস্তাহাব বলেছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশের মুসলমানগণ এ শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ওরশ, জৌলুস ও আতশবাজিসহ অনেক অনৈসলামিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতে পটকা ফোটানো, কবরে মোমবাতি জ্বালানো ইত্যাদি যা সম্পূর্ণই হারাম এ ধরনের কাজ শবে বরাতের সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। সেইসাথে গ্রাম-গঞ্জের মানুষের দেখা যায় এ দিনকে কেন্দ্র করে বহু আগে থেকেই আলো চাল যা হেলারুটি প্রস্তুত করা ও মসজিদে জিলাপি ইত্যাদি বিতরণের জন্য দিনব্যাপি ব্যস্ত থাকেন। সারাদিন রোদ-গরমে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হওয়ার পর রাতে কি দু রাকাত নামাজ পড়তে ইচ্ছে জাগে? ওই কর্মকাণ্ডগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো সম্পূর্ণই বেদাত ও কুসংস্কার। আল্লাহতায়ালা ওই কাজ থেকে আমাদের হেফাজত করুন।

 

সিনিয়র শিক্ষক

বুজরুকগড়গড়ি মাদরাসা, চুয়াডাঙ্গা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *