ভোট সহিংসতায় নিহত ২৪ : ককটেল ও পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণ : ভাঙচুর

স্টাফ রিপোর্টার: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার ও শনিবার মধ্যরাতের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে হামলা, সহিংসতা, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। বাকিরা বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী। নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দিনাজপুর, নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁও জেলায়। এসব জেলায় ৪ জন করে মোট ১২ জন মারা গেছেন। এছাড়া রংপুর ও ফেনীতে দুজন নিহত হয়। লালমনিরহাট, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, পিরোজপুর, নওগাঁ, নোয়াখালী ও গাইবান্ধায় ১ জন করে নিহত হয়।

সহিংসতার ঘটনায় পাঁচ শতাধিক কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি দলের প্রার্থীদের সমর্থকরা ভোট কেন্দ্র দখল করে নেন। এর প্রতিবাদে প্রায় ৫০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। বর্জনকারীদের অধিকাংশই জাতীয় পার্টি-জেপি, জাসদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৩ আসনে জাতীয় পার্টি-জেপির ডা. ফরিদ আহমেদ ভোট দিতে গিয়ে দেখেন তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। প্রতিবাদে তিনি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ৫টি ও কোটচাঁদপুর উপজেলায় ২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। মহেশপুর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া, কোলা, রামচন্দ্রপুর, নওদাগা ভোটকেন্দ্র ও ব্যালট পেপার পুড়িয়ে দেয়ায় এবং সামন্তা ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়ায় ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছেন প্রিসাইডিং অফিসার।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তিনটি ঘটনায় দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনে তিনজন এবং দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে একজন মারা গেছেন। পার্বতীপুরের উত্তর শালন্দার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার পবন কুমার সরকার জানান, গতকাল ভোট শুরুর পর সকাল ৯টা থেকে দুর্বৃত্তরা ওই কেন্দ্রে হামলা চালায়। একের পর এক হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। বেলা ১১টায় ওই কেন্দ্রে কর্মরত ওয়াহেদ আলী নামে এক আনসার সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে তারা। হামলায় প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশসহ ৩২ জন আহত হয়। প্রিসাইডিং অফিসার জানান, এ ঘটনার পর তারা আত্মরক্ষার্থে ভোটকেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। ফলে কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়।

পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী রিটার্নিং অফিসার জানান, উপজেলার ৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২০টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। অপরদিকে গতকাল দুপুরে পার্বতীপুর মন্মথপুর কোঅপারেটিভ হাইস্কুল কেন্দ্রে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা যৌথবাহিনীর ওপর হামলা করলে তারা পাল্টা গুলি করে। এতে পার্বতীপুর জাগপার যুগ্ম আহ্বায়ক রাইহান মাসুদ (২৪) মারা যান। মন্মথপুর ইউনিয়নের হয়বতপুর গ্রামের বৈষ্ণবপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে গতকাল বেলা ২টার দিকে বিএনপি কর্মী চুন্নুর (৩০) গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। তবে কার গুলিতে তিনি মারা গেছেন তা নিশ্চিত করা যায়নি।

এর আগে শনিবার রাতে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে সদর উপজেলার নশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ১৮ দল ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হলে বাবুল (২৮) নামে এক বিএনপি কর্মী গুলিতে নিহত হয়। নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের নুরুল্লাবাদ ইউনিয়নের রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গতকাল ভোটদানে বাধাদানকে কেন্দ্র করে যৌথবাহিনীর সাথে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় যৌথ বাহিনী গুলি ছুঁড়লে ৮ জন আহত হন। এর মধ্যে বাবুল হোসেন (৩৫) নামে একজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।

রংপুর-৪ আসনে পীরগাছার মেকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেউতি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে রোববার গভীর রাতে ভোটের সরঞ্জাম ছিনতাই, অগ্নিসংযোগ করতে গেলে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় পুলিশের গুলিতে শিবিরকর্মী হাজিউজ্জামান (১৪) ও জামায়াতকর্মী মেরাজুল ইসলাম (৩৫) নিহত হয়। সংঘর্ষে ১০ প্রিসাইডিং অফিসারসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়।

মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দক্ষিণ শিমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের কাছে পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণের চেষ্টাকালে ছাত্রদল নেতা কঙ্কন মিয়া (২৩) নিহত হয়েছে। আব্দুল হক মাস্টারের ছেলে কঙ্কন মিয়া কাঠাদিয়া-শিমুলিয়া ইউপি ছাত্রদলের যুগ্মসম্পাদক। পুলিশ জানায়, কঙ্কন শিমুলিয়া ভোট কেন্দ্রে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করতে গেলে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে ধাওয়া করলে সে পুকুরে ঝাঁপ দেয়। পরে পুকুর থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার সময় সে মারা যায়।

ফেনীর সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়া বড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গতকাল সকালে ভোট চলাকালে ভোটবিরোধীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে বিএনপির ৩ কর্মী গুরুতর আহত হয়। এদের মধ্যে জামশেদ আলমকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করে। অপর ২ জনকে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে দুপুর ১২ টার দিকে শহীদ উল্লাহ মারা যান।

লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলা শ্রীরামপুর, বুড়িমারী, কুচলীবাড়ী ও জগতবেড় ইউনিয়নের ৫টি ভোটকেন্দ্রে হামলা, অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী আসবাবপত্র পুড়ে যাওয়ায় ২ নং ভাণ্ডারদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ প্রায় ৩ ঘণ্টা স্থগিত রাখে স্থানীয় প্রশাসন। পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ১ জন আনসার সদস্যসহ ৩ জন আহত হয়। শনিবারে বাউরা সফিরহাট বাজারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ফারুক হোসেন (৩০) রংপুরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রবিবার ভোরে নিহত হয়েছেন। এদিকে গতকাল সকালে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে স্বেচ্ছাসেবক দলের ওয়ার্ড সভাপতি মোবারক হোসেন নিহত হন।

লক্ষ্মীপুর-১ আসনে রামগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে শিবিরকর্মীরা বেশ কয়েকটি ব্যালট বাক্স লুট করেছে। গতকাল দুপুরে পুলিশের গুলিতে চন্ডিপুর ইউনিয়নের মাছিমপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় রুবেল নামে এক শিবিরকর্মী পুলিশের গুলিতে নিহতসহ আহত হয়েছে ২ শিবির কর্মী। জালভোট ও কেন্দ্র দখলের ফলে দফায় দফায় ভোট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় প্রশাসন।

এ আসনের পানিওয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়, কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিশ্চর প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের কমলনগর উপজেলার পশ্চিম চরলরেন্স মহিলা দাখিল মাদরাসাসহ ৪টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। সিলেট-৪ আসনের কোম্পানিগঞ্জের ভোলাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গতকাল পুলিশের সাথে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শট গানের ২৪টি গুলি ও ১টি টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এ সময় একজন পোলিং এজেন্ট আহত হন।

সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনে ভোটগ্রহণ চলাকালে গতকাল দুপুরে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা চর নবীপুর ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে ২টি ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে। এরপর তারা ভোট কেন্দ্রের ৫টি বুথ পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়ে তাদের হটিয়ে দেয়। এ ঘটনার পর বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে এই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয়।

শেরপুর পৌর এলাকার দিঘারপাড় বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে প্রায় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা লাঠিসোঠা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা, ব্যালট বাক্স ও বেশ কিছু ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় হামলাকারীদের আক্রমণে কর্তব্যরত এএসআই নূর আলম গুরুতর আহত হন। ওই দুই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।

খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) ও খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী থানা) আসনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী রাশিদা করিম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুজ্জামান খান খোকন। চট্টগ্রামে মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গোলযোগের মধ্যদিয়ে গতকাল ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। জেলার বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সহিংসতায় এক শিবির কর্মী নিহত ও আনসার সদস্যসহ অর্ধশতাধিক গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন। সাতকানিয়ায় ভোট কেন্দ্রে হামলা করে ব্যালট পেপার ছিনতাই ও প্রিজাইডিং অফিসারসহ পাঁচজনকে কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। সীতাকুণ্ডের রহমতনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের বিবস্ত্র করার পর ওই কেন্দ্রে আর ভোটারদের ভোট প্রদান করতে দেখা যায়নি।

বড় হাতিয়া ভবনীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করতে গিয়ে বিজিবির গুলিতে মিজানুর রহমান লালু (২২) নামে এক শিবির কর্মী নিহত হন। চুনতি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ককটেল বিস্ফোরণে হালিমা খাতুন নামে এক আনসার সদস্য আহত হয়। একই কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। কলাউজান খালাসীপাড়া কেন্দ্রে সোনা মিয়া (৫৬) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়। সাতকানিয়ায় দুপুর একটার দিকে শতাধিক দুর্বৃত্ত ঢেমশা বড়ুয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রবেশ করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর এজেন্ট শামসুল ইসলাম, প্রিসাইডিং অফিসার মো. জামাল উদ্দিনসহ পাঁচজনকে কুপিয়ে আহত করে। এ সময় তারা ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনের সরঞ্জাম ছিনতাই এবং কেন্দ্রে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সাথে ১৮ দলীয় জোট কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও গুলি বিনিময়ের ঘটনায় কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়। চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালী আসনে ব্যাপক জাল ভোট আর কারচুপির মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে ১১০টি কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় সবকটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে নেতা-কর্মীরা ব্যাপকহারে জাল ভোট দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাজশাহীর চারঘাটায় গতকাল বিকালে আওয়ামী লীগ ও ১৮ দলের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ছয় জন আহত হন। বরগুনা-১ আসনের বিএনএফ সমর্থিত প্রার্থী মো. খলিলুর রহমান দুপুরে আমতলী একে পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরিদর্শনে গেলে তাকে লাঞ্ছিত করে নৌকা মার্কার সমর্থকরা। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আমতলী বন্দর ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে মোরগ মার্কার এজেন্ট জুয়েল মৃধাকে নৌকার সমর্থকরা মারধর করে বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে সহিংসতায় ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। ১৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী ডা. ফরিদ আহমেদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন যে তার ভোট আগেই দেয়া হয়ে গেছে এই কারণে তিনি নির্বাচন বর্জন করেন। পরে রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানানোর পরেও প্রতিকার না পেয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।

নোয়াখালীর হাতিয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আমীরুল ইসলাম আমীর নির্বাচন বর্জন করেন। দুপুরে উপজেলা সদরের ওছখালী বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ ও আমার ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদান করা হচ্ছে। এ কারণে ভোট বর্জন করেছি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে হরতালকারীদের ধাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাকের চাপায় সাইফুল ইসলাম (৩০) নামে একজন মারা যায়।

কুড়িগ্রাম-১ আসনে দুপুর ১টার দিকে নেওয়াশী ইউনিয়নের ঘরজেয়াটারী ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও ১৮ দল কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে ৬ জন আহত হন। ঘরজেয়াটারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশে দু’পক্ষের সংঘর্ষে রোস্তম আলী (৫০), ইউপি সদস্য ফরিদা বেগম (৩০) ও আনোয়ার হোসেন (৩৮) আহত হয়। এর মধ্যে রোস্তম আলীর অবস্থা আশংকাজনক।

জামালপুরে ৫টি আসনের মধ্যে ৪টি আসনে ৫টি ভোটকেন্দ্রে ককটেল নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ, হামলা ভাঙচুর ও সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ১০ জন। বরিশাল-২ আসনের উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের কারফা ভোট কেন্দ্রের সন্নিকটে গতকাল দুপুরে দু দল ভোটারের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। একইদিন বিকালে বরিশাল-৩ আসনের আগরপুর আলতাফ মেমোরিয়াল ভোটকেন্দ্রের সন্নিকটে জাতীয় পার্টির (এ) প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্কার্সপার্টির প্রার্থীর ৫ জন সমর্থক আহত হয়েছে।

বিকেল ৩টার দিকে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে বরিশাল-৩ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুর সমর্থক বাদল মিয়ার নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে আহত করা হয় প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্কার্সপার্টির প্রার্থী টিপু সুলতানের ৫ জন সমর্থককে।

গাইবান্ধার ৪টি আসনের ৪৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২০১টি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে গাইবান্ধা-০১ সুন্দরগঞ্জ আসনে ৪৭টি, গাইবান্ধা-০২ সদরে ১২টি, গাইবান্ধা-০৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সাদুল্লাপুরে ২৫টি ও পলাশবাড়ীতে ৫৩টি এবং গাইবান্ধা-০৪ গোবিন্দগঞ্জে ৬৪টি ভোট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা সম্ভব না হওয়ায় স্থগিত করা হয়েছে। এদিকে ভোট কেন্দ্রে সংঘর্ষে এক শিবিরকর্মী নিহত, একজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিখোঁজ রয়েছেন ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। নিহত শাহাবুল ইসলাম তারা (২৮) উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মনমথ গ্রামের খিজির উদ্দিনের ছেলে।

হবিগঞ্জে রোববার ভোরে ৪০/৫০ জনের একদল দুর্বৃত্ত বানিয়াচঙ্গ উপজেলার রেদোয়ানা দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে প্রবেশ করে দায়িত্বরত পুলিশ আনসারকে মারধর করে। তারা ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেয়। এসময় সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার গোপাল দাশ, আনসার হাবিজুর রহমান, আবু তাহের আহত হন। ফলে ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়নি। আগের দিন রাতে একই উপজেলার তোপখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হলে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স পুড়ে যায়। ফলে ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়নি।

গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে চৌধুরী পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪টি পেট্রোল বোমা বিস্ফোরিত হয়। এসময় পুলিশ গুলি ছুঁড়লে কমল (২৪) নামে এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হন। তাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হবিগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের ভোট কেন্দ্রে ব্যালট পেপার লুট করতে গিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জামায়াতের কর্মী জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) নিহত হয়েছে। গত শনিবার রাত দুইটার দিকে ওই আসনের ডিমলা উপজেলার খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ব্যাপারীতলা আলিম মাদরাসা কেন্দ্রে ওই ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দুর্বৃত্ত কর্তৃক ভোটকেন্দ্রে হামলা, ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার কারণে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) ৯টি ভোট কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। দুপুরে ডিমলা নিজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নীচতলায় আগুন দেয়া হয়। ডিমলা উপজেলার ১০টি কেন্দ্রে জামায়াত-শিবির হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে ওইসব কেন্দ্রের ঘর, ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার পুড়িয়ে দেয়। এ সময় ১০ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৭ জন আনসার সদস্য, ৮ পুলিশ সদস্যসহ ৪০ জন আহত হয়। ওই ১০ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. মোজাম্মেল হোসেনের সমর্থকরা ওই আসনে আওয়ামী লীগের দু বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুর রহিম খান ও এসএম মনিরুল হকের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সন্ধ্যায় মোরেলগঞ্জ পৌরসভার কৃষি ব্যাংক রোড ও কলেজ রোডে পৃথক এই হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলাকারীদের প্রহারে আব্দুর রহিম খানের গাড়িচালক মো. ইসাহাক (৪৫) ও তার প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী আল আমিনসহ (৩০) অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। এ সময় আত্মরক্ষার্থে আব্দুর রহিম খানের ভাই আব্দুল হাই খান তার বৈধ বন্দুক দিয়ে অন্তত পনের রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়েন বলে জানা যায়।

পটুয়াখালী-১ (সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকি) আসনে গতকালভোট গ্রহণ চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর উপজেলার খাসেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৩টি ককটেল উদ্ধার করেছে ৱ্যাব ও পুলিশ। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ঘোপখালী ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ছিনতাইকালে পুলিশ দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালিয়ে তাদেরকে প্রতিহত করে। এছাড়া খাসের হাট ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের শেষ মুহূর্তে চারটি পটকা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জালভোট দেয়ার চেষ্টাকালে পুলিশ তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালালে তারা পালিয়ে যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *