নিহত একজন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল অফিসার
স্টাফ রিপোর্টার: কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয় দিয়ে বাসায় ঢুকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তাসহ দুজনকে কুপিয়ে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর ৩৫ নম্বর উত্তর ধানমণ্ডির (লেক সার্কাস কলাবাগান) আছিয়া নিবাস নামক সাততলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- জুলহাস মান্নান (৪০) ও তনয় মজুমদার (৩৮)। জুলহাস সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির খালাতো ভাই ও ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা ছিলেন। গত দুই মাস আগে পদোন্নতি পেয়ে ইউএসএইডে যোগ দিয়েছিলেন। জুলহাস সমকামীদের নিয়ে প্রকাশিত পত্রিকা রূপবান এর সম্পাদক ছিলেন। আর তনয় মজুমদার ছিলেন জুলহাসের বন্ধু। তিনি নাট্যকর্মী ছিলেন।
দুর্বৃত্তদের হামলায় ওই ভবনের নিরপত্তাকর্মী পারভেজ মোল্লাও গুরুতর আহত হয়েছেন। কপালের বাম পাশে কোপের জখম নিয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। কিলিং মিশন শেষ করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিরোধ করতে গিয়ে আইডিয়াল কমার্স কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন রিংকন আহত হন। ঘটনা তদন্তে পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের আলামত সংগ্রহ করছেন। তবে কারা, কেন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে পুলিশ কোনো তথ্য জানাতে পারেনি। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিঞা বলেন, ৫/৬ জন দুর্বৃত্ত কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয় দিয়ে বাসায় প্রবেশ করে এ হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের হাতে যে পার্সেল ছিলো তার ভেতর কাগজ ও ডাবের খালি টুকরা ছিলো। ক্যামোফ্ল্যাক্স করার জন্য এই কুরিয়ার সার্ভিসের পরিচয় বহন করেছে দুর্বৃত্তরা। এর সাথে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না তা তদন্ত করা হচ্ছে।
আছিয়া নিবাসের নিরাপত্তা কর্মী পারভেজ মোল্লা বলেন, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী ছয়জন যুবক ওই ভবনের নিচে আসে। তারা সবাই কুরিয়ার সার্ভিসের সার্ভিস ডেলিভারিম্যানের একই ধরনের পোশাক পরিহিত ছিলো। তারা নিজেদেরকে কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী বলে পরিচয় দেয়। তাদের দুই জনের হাতে পার্সেল বাক্স ছিলো। তারা নিচ তলায় সিকিউরিটি কক্ষে এসে বলে যে জুলহাস সাহেবের নামে পার্সেল এসেছে। ওপরে গিয়ে দিতে হবে। এ কথা বলে তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে। তাদের থামিয়ে দিয়ে ইন্টারকমে আমি দোতলায় জুলহাস সাহেবের ফ্ল্যাটে কল দিলে কেউ রিসিভ করে না। তখন আমি তাদের নিচে দাঁড় করিয়ে দ্বিতীয় তলায় জুলহাস সাহেবের ফ্ল্যাটে যাই। কিন্তু তারাও আমার পিছু পিছু সেখানে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়। আমি দরজায় কলিং বেল চাপি। এরপর তারা আমার মাথায় কাঠের বাটাম দিয়ে আঘাত করে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই। এর পরপরই জুলহাস সাহেব ফ্ল্যাটের দরজা খোলেন। তখন তাদের মধ্য থেকে তিনজন ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে। তারা সেখানে জুলহাস সাহেবকে পেয়ে আল্লাহু আকবার বলে চিত্কার করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। তখন তার চিত্কারে তার বন্ধু তনয় মজুমদার ঘরের ভেতর থেকে ড্রইং রুমের কাছাকাছি এলে ওই তিন যুবক তাকেও উপর্যুপরি কোপায়। এ সময় তাদের চিত্কার শুনে জুলহাস সাহেবের মা ছকিনা ম্যাডাম ডাকাত ডাকাত বলে চিত্কার করেন। তখন হামলাকারীরা ওই বাসা থেকে বের হয়ে চলে যায়।
এদিকে ওই বাসার পাশের ফ্ল্যাটের এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাশের ফ্ল্যাটে ডাকাত পড়েছে বলে চিত্কার শুনে তিনি বারান্দায় আসেন। এরই মধ্যে দোতলা থেকে হামলাকারীরা তিন তলার ফ্ল্যাটের দরজায় লাথি মারতে থাকে। এতে ওই অ্যাপার্টমেন্টের তিন তলা থেকে সাত তলা পর্যন্ত সকল ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা দরজা খুলে বের হয়ে আসতে সাহস পাননি। তখন তিনি বারান্দা থেকে ডাকাত বলে চিত্কার করেন। এ সময় ওই যুবকরা বামের দিকে মোড় নিয়ে লেক সার্কাসের গলিতে ঢুকে যায়।
অন্যদিকে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, লেক সার্কাসে ডলফিনের গলিতে কলাবাগান থানা পুলিশের একটি টহল টিমের সামনে ওই যুবকরা পড়ে। তখন পুলিশ তাদের আটক করার চেষ্টা করলে একজন পুলিশকে আহত করে যুবকরা পালিয়ে যায়। এরপর তারা দ্রুত গলি থেকে বের হতে গেলে আনোয়ার হোসেন রিংকন নামক একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাদের পথরোধ করার চেষ্টা করে। তখন তারা রিংকনের মাথায় ও হাতে কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘাতকদের চিহ্নিত করতে রিংকনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য থানায় নিয়ে গেছে। রিংকনের মা আনু বেগম জানান, তারা ইউসুফ মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ডাকাত ডাকাত চিত্কার শুনে রিংকন বাসা থেকে বের হয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে আহত হন।
গতকাল সরেজমিনে ওই ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সিঁড়িতে ছোপ ছোপ রক্ত। ফ্ল্যাটের দরজা ও ঘরের মেঝেতে রক্ত পড়ে আছে। বাসার ড্রইং রুম থেকে আরেকটি ঘরে প্রবেশের দরজার সামনে রক্তের ওপর জুলহাস মান্নানের লাশ পড়ে আছে। তার পরনে থ্রি কোয়ার্টার হাফপ্যান্ট ও হাতকাটা আকাশী নীল রঙের গেঞ্জি ছিলো। তার থেকে ২/৩ ফুট দূরে ঘরের ভেতর তনয় মজুমদারের লাশ পড়ে রয়েছে। এ সময় গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই, ৱ্যাব ও থানা পুলিশ সেখানে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের আলামত সংগ্রহ করে। রাত ১১টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালমর্গে পাঠায়।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে জুলহাসের খালাতো বোন সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিঞা, অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির উপকমিশনার (রমনা) আবদুল বাতেনসহ ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। উপকমিশনার আবদুল বাতেন জানান, নিহতদের একজনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। অন্যজনের নাম জানলেও বিস্তারিত পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। ঘাতকরা যে পথ ধরে পালিয়ে গেছে, পুলিশ ওই রাস্তার আশপাশের ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
জানা গেছে, জুলহাসের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের সাহারাস্তি থানার নড়িংপুর গ্রামে। তার বাবা মৃত আবদুল মান্নান। তিনি উপসচিব ছিলেন। মায়ের নাম ছকিনা খাতুন (৯০)। তিনি শেরে বাংলানগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তনয় মজুমদার একজন নাট্যকর্মী।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিন্দা, জড়িতদের গ্রেফতার দাবি: ঢাকায় অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীদের হামলায় মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির কর্মী জুলহাস মান্নানসহ দুইজনের নিহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। গতকাল সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জুলহাস মান্নান ও আরেক যুবকের বর্বর হত্যাকাণ্ডে আমি মর্মাহত, বিধ্বস্ত। মার্কিন দূতাবাসে কর্মরতদের কাছে জুলহাস কর্মীর চেয়ে ছিলো বেশি কিছু। সে খুবই প্রিয় বন্ধু ছিলো। জুলহাস, অন্য ভিকটিম ও আহতদের সাথে আমাদের দোয়া রয়েছে। আমরা এই জঘন্য সহিংসতার নিন্দা জানাই। একই সাথে এই ঘটনায় জড়িতদের ধরতে শক্ত পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।