প্রবাস ফেরত হাসানুজ্জামান মিলনকে নৃশংসভাবে খুন : স্ত্রীর পরকীয়ার বলি?

 

 

 

 

 

মেহেরপুর গাংমীর ঝিনেরপুর এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার : স্ত্রী, শালিকা ও ভগ্নিপতি গ্রেফতার

গাংনী প্রতিনিধি: মেহেরপুরের গাংনীতে হাসানুজ্জামান মিলন (৩৪) নামের এক কুয়েত প্রবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল সোমবার সকালে গাংনী পৌরসভাধীন ঝিনেরপুর এলাকা থেকে মিলনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মাথায় হাতুড়ি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। হতভাগা মিলনের স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের বলি হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। হত্যকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে নিহতের স্ত্রী, স্ত্রীর বোন ও ভগ্নিপতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নিহত মিলন সদর উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ মল্লিকের ছেলে। কুয়েত থেকে সম্প্রতি ছুটিতে দেশে ফিরে স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে গাংনী শহরের বনবিভাগ পাড়ার নিজ বাড়িতে বসবাস করছিলেন তিনি। গ্রেফতারকৃত আব্দুর রশিদ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মালিহাদ পুলিশ ক্যাম্পে কনস্টেবল পদে কর্মরত। গাংনী শহরে তার বাসা। নিহতের পিতা জানান, কিছুদিন আগে কুয়েত থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসে মিলন। রোববার বিকেলে গ্রামের বাড়ি থেকে গাংনীর বাড়ির উদ্দেশে মোটরসাইকেলযোগে রওনা দেয়। সকালে মিলনের স্ত্রী তাদেরকে জানায় মিলনের কোনো খোঁজ মিলছে না। পরে ঘটানাস্থলে এসে তারা মিলনের লাশের পরিচয় শনাক্ত করেন।

গাংনী ঝিনেরপুলের পাশে সাহারবাটি সড়কের ধারে ঝোপঝাড়ে ঘেরা গর্তের মধ্যে গতকাল সকালে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা এক ব্যক্তির লাশ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে গাংনী থানা পুলিশের একটি দল লাশ উদ্ধার করে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে লাশের পরিচয় শনাক্ত হচ্ছিলো না। পরে নিহতের পিতা ঘটনাস্থলে এসে পরিচয় শনাক্ত করেন।

পুলিশ জানায়, রোববার সন্ধ্যারাতে হত্যাকারীরা মিলনকে কৌশলে ঘটনাস্থলে ডেকে নিয়ে যায়। তারা মিলনের পূর্বপরিচিত কিংবা কাছের মানুষ। সেখানে পৌঁছুলে মিলনের মাথার পেছনসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাতুড়ি দিয়ে উপর্যুপরি পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ পার্শ্ববর্তী গর্তের মধ্যে ফেলে পালিয়ে যায়। রোববার সন্ধ্যারাতে ঘটনাস্থলে তিনজন অজ্ঞাত ব্যক্তি ও মিলনের মোটরসাইকেল দেখতে পেয়েছিলো ওই পাড়ার এক কিশোর। টর্চলাইট মারতেই অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি মোটরসাইকেল ফেলে বাঁশবাড়িয়া গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মিলনের ব্যবহৃত ডিসকভারি ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। কিন্তু লাশ ঝোপে ঘেরা গর্তের মধ্যে থাকায় তখন কারো নজরে আসেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ।

এদিকে মিলনের লাশ উদ্ধারের সময় তার স্ত্রী মানছুরা খাতুন ও তার বোন মসনুয়ারা খাতুন এবং ভগ্নিপতি আব্দুর রশিদ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় নিহতের পরিবারের লোকজন তাদের দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাদের দায়ী করে মারপিট শুরু করে। পরে অবশ্য পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করে গ্রেফতার দেখিয়ে থানায় নেয়। গতকালই নিহতের পিতা বাদী হয়ে ওই তিনজনসহ আরো কয়েকজনকে আসামি করে গাংনী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

নিহতের পিতা অভিযোগ করেন, মিলন কুয়েত থাকা অবস্থায় গাংনী শহরের এক ব্যবসায়ীর সাথে মানছুরার পরকীয়া প্রেমসম্পর্ক গড়ে ওঠে। মিলন বাড়িতে এলে এ নিয়ে তাদের দাম্পত্য কলহ বিরাজ করছিলো। পথের কাঁটা পরিষ্কার করতেই স্ত্রী ও তার বোন-ভগ্নিপতির যোগসাজশে মিলনকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দাবি করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্যামপুর গ্রামের ধর্ণাঢ্য আব্দুল হামিদ মল্লিকের তিন ছেলের মধ্যে মিলন বড়। মেজ ছেলে প্রবাসী ও ছোট ছেলে কুষ্টিয়ায় লেখাপড়া করেন। একমাত্র মেয়ে বিবাহিতা। বেশ কয়েক বছর আগে মিলকে কুয়েতে পাঠান আব্দুল হামিদ। বছর আটেক আগে গ্রামের চাচাতো বোন সর্ম্পকীয় মানছুরা খাতুনকে বিয়ে করেন মিলন। মিলনের একমাত্র ছেলের বয়স সাত বছর। মিলনের ভালোবাসার সরলতার সুযোগ নিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমানোর রঙিন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন মানছুরা। এ কারণে তিনি শ্বশুরালায় থেকে অন্যত্র বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। মিলনের আয়ের একটি বড় অংশ কৌশলে হস্তগত করেন স্ত্রী মানছুরা। ওই টাকা দিয়েই তিনি স্বামীর অমতে গাংনী বনবিভাগের পাশে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। অবশ্য বাড়ির জমির মালিকানা মানছুরার নামে। এ নিয়েও মিলন ও তার পিতার পরিবারের সাথে মানছুরার পরিবারের বিরোধ সৃষ্টি হয়। বেশ কিছুদিন থেকেই মানছুরা ছেলেকে নিয়ে গাংনীর ওই বাসায় বসবাস করে আসছেন। এর পেছনে পরকীয়া প্রেমের সুবিধার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। স্বামীর অনুপস্থিতিতে গাংনী শহরের এক ব্যবসায়ীর সাথে স্বামীর মতোই বসবাস করতেন তিনি। তার এ কাজে সহযোগিতা করেছেন গ্রেফতার হওয়া তার বোন ও ভগ্নিপতি। পরকীয়ার প্রেমের বিষয় নিয়ে মিলনের পরিবারের সাথেও তার ব্যাপক বিরোধ সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি মিলন বাড়ি আসার পর পরকীয়া প্রেম নিয়ে দাম্পত্য কলহ চলছিলো। এর জের ধরেই স্ত্রীর সহযোগিতায় পরকীয়া প্রেমিক ও তার লোকজন মিলনকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও নিহতের পরিবার।

এদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যকাণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন মানছুরা ও তার বোন ভগ্নিপতি। আরো তথ্য পেতে তাদেরকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান গাংনী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকরাম হোসেন। লাশ উদ্ধারের আগে থেকে মানছুরার পরকীয়া প্রেমিক পলাতক থাকলেও দ্রুত তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন গাংনী থানার এসআই শঙ্কর কুমার ঘোষ। তিনি জানান, নিহতের মাথার পেছনের দিকে আঘাতের বেশ কয়েকটি ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। এছাড়াও দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মাথার পেছনে হাতুড়ির আঘাতে রক্তক্ষরণ হয়ে মিলনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

গতকাল দুপুরে নিহতের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালমর্গ থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। গতকালই শ্যামপুর গ্রামে নিহতের দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় শরিক হন এলাকার হাজারো মানুষ। গতকাল সকালে মিলন হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই যেন পাগলপ্রায় তার পিতা-মাতাসহ পরিবারের লোকজন। গোটা পরিবার ও গ্রামে বিরাজ করছে শোকের ছায়া। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে যেন কেউ-ই শান্তন্ দিতেও পারছেন না। মিলনের মতো একজন ভালো ছেলে কীভাবে খুন হতে পারে তা ভেবে পাচ্ছে না তার পরিবার ও গ্রামবাসী।

Leave a comment