স্টাফ রিপোর্টার: এশিয়ার নোবেলখ্যাত র্যামন ম্যাগ সাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বুধবার বিকেল ৩টায় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের ফতুল্লার দেলপাড়াস্থ ভুঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। একটি গার্মেন্ট কারখানার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক এ সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। গাড়িচালক রিপনের বর্ণনা অনুযায়ী নোয়াহ ব্র্যান্ডের নীল রঙের মাইক্রোবাস তাদের গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। তখন তারা গাড়ি থেকে নামলে সাত-আটজন ব্যক্তি আবু বকর সিদ্দিককে অস্ত্রের মুখে নিয়ে যায়। ওই ব্যক্তিদের চুল ছোট ও পরনে টি-শার্ট ছিলো। ‘আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান’ বলে আবু বকর চিৎকার করলেও অস্ত্রধারীদের ভয়ে কেউ সামনে আসার সাহস পায়নি। অপহরণের খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জে ছুটে যান সৈয়দা রিজওয়ানান হাসান। বিকেলে তিনি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, আমার স্বামী খুবই সাধারণ, সহজ-সরল একজন মানুষ। তার কোনো শত্রু নেই। আমার পেশাগত কারণে সংক্ষুব্ধ কোনো গোষ্ঠীর সাথে জড়িত থাকতে পারে। আমার কারণে অনেকেরই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাদের তালিকা আমি পুলিশকে দেবো। এ ঘটনায় অজ্ঞাত সাত-আটজনকে আসামি করে ফতুল্লা থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার পরপরই হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অপহরণের খবর শুনে সাথে সাথে পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করেছে। আশা করি ভালো খবর পাবো। আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের কারণ অনুসন্ধান ও তাকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রাতে রিজওয়ানা হাসান বাদী হয়ে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেছেন।
এদিকে আবু বকর সিদ্দিকের গাড়িচালক রিপন সাংবাদিকদের জানান, ফতুল্লা পোস্ট অফিস রোডসংলগ্ন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরনো সড়কের পাশে অবস্থিত হামিদ ফ্যাশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে চাকরি করতেন আবু বকর সিদ্দিক। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। সম্প্রতি হামিদ ফ্যাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হামিদ ফ্যাশন কর্তৃপক্ষ আবু বকর সিদ্দিককে প্রতিষ্ঠানটি চালানোর জন্য দায়িত্ব দেয়। বুধবার দুপুরের পর আবু বকর সিদ্দিক ফতুল্লা থেকে তার নিজস্ব প্রাইভেটকারে (ঢাকা মেট্রো গ-১৫-৮৮০০) ঢাকার বাসার উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল ৩টায় তাকে বহনকারী গাড়িটি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের ভুঁইয়া ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি দেলপাড়া রোডের সামনে পৌঁছামাত্র পেছন থেকে একটি মাইক্রোবাস প্রাইভেট কারটিকে ধাক্কা দেয়। রিপন বলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে স্যারকে (আবু বকর সিদ্দিক) প্রাইভেট কার থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে। এরপর নীল রঙের একটি মাইক্রোবাসে আবু বকর সিদ্দিককে তুলে উত্তর দিকে দ্রুত চলে যায়। এর আগে তারা (অপহরণকারীরা) আমার চোখে কিছু একটা ছিটিয়ে দেয়। এতে আমার চোখে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। কোনো মতে চোখ খুলে অপহরণকারীদের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পাই। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আকতার হোসেন ও র্যাব ১১’র সদস্যরা। অপহৃত আবু বকর সিদ্দিকের স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বিকেলে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমাদের এমন কোনো অর্থবিত্ত নেই যে কেউ মুক্তিপণের জন্য তাকে অপহরণ করবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, আমার পেশাগত কারণে ক্ষুব্ধ কোনো গোষ্ঠী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ করতে পারে।’ একপর্যায়ে রিজওয়ানা হাসান পুলিশ সুপারকে বলেন, শুনেছি নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি টর্চার সেল রয়েছে, সেগুলোতে একটু অভিযান চালান।
এদিকে রিজওয়ানা হাসানের স্বামীকে অপহরণের পরপরই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা বিষয়টি তদন্ত শুরু করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন। এ জন্য তার কিছু শত্রু রয়েছে। বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, বড় বড় কয়েকটি আবাসন কোম্পানির আবাসন প্রকল্প, হাতিরঝিলে বিজিএমইএ ভবন নিয়ে তিনি সোচ্চার ছিলেন। এসব কারণেও তার স্বামীকে অপহরণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণকারীরা তাদের মাইক্রোবাসে তোলার পরপরই তার মোবাইলটি বন্ধ করে দেয়। এ জন্য তাকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা তাকে উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বেশ কয়েকটি ক্লু নিয়ে র্যাবের গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আলোচিত এ ঘটনার পরপরই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও এটি নিয়ে কাজ করছে। তবে তার সর্বশেষ অবস্থানের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’। গতকাল রাতে এক বিবৃতিতে অধিকার এ উদ্বেগের কথা জানায়।