মোবাইলফোন ট্রাকিঙে পাওয়া তথ্যেই সম্মিলিত খোঁজাখুজি : ভুট্টাক্ষেতে অর্ধগলিত মৃতদেহ মিললেও হত্যার আলামত মেটে ঘরে
ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আলম আশরাফ/জহির রায়হান সোহাগ: অপহরণ নয়, আপন ইচ্ছেই বাগদিবাড়ির শ্রীমতি আভারানীর কাছে গিয়ে লাশ হয়েছেন আইলহাসের কাঠব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম (৫৭)। নিখোঁজ থাকার ৬ দিনের মাথায় গতকাল সোমবার দুপুরে আইলহাস-রায়লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী কুড়ির মাঠের ভুট্টাক্ষেত থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের সম্মিলিত খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সকাল ১০টায় ভুট্টাক্ষেতে লাশ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। গত দু দিনের পুলিশ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। আরও একজনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- রায়লক্ষ্মীপুরের বাগদিপরিবারের নেঙটো সরকারের স্ত্রী শ্রীমতি আভারানী (৪২), তার দু ছেলে সঞ্জয় (২০) ও সুজন (২২), আভারানীর স্বামীর বোন তুলসি রানী (৪০)। এছাড়া একই গ্রামের বাগানপাড়ার তহির আলীর ছেলে জহরুল ইসলামকে গতপরশু ডিবি পুলিশ তাদের কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাদ শুরু করেছে। ওইদিনই আমিনুল ইসলামের মেয়ে ফাতেমা খাতুন মিতা বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় অপহরণ মামলা করেন। মামলার পর আমিনুলের মোবাইলফোন ট্রাকিং করে পুলিশ জানতে পারে, আভারানীর সাথেই শেষ কথা হয়েছে। পুলিশ আভারানীকে গ্রেফতার করে। তাছাড়া মোবাইলফোনটির অবস্থানও আভারানীর বাড়ির আশপাশে থাকার বিষয়টি ট্রাকিঙে জানার পর মামলার বাদীর লোকজন সম্মিলিতভাবে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। মসজিদের মাইকেও বলা হয়, আমিনুলের মোবাইলফোনটি এলাকাতেই রয়েছে। সকলে একটু খুঁজে দেখুন। মোবাইলফোন খুঁজতে গিয়েই পাওয়া যায় অর্ধগলিত লাশ। পরনের পোশাকের পকেটেই ছিলো মোবাইলফোনসহ নগদ ৯ হাজার টাকা। পুলিশের ধারণা, আভারানীর বাড়িতেই হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পার লাশ সেখানেই ছিলো। পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে লাশ ঘর থেকে অদূরবর্তী মাঠের ভুট্টাক্ষেতে ফেলে রেখেছে। আর যে ঘরে লাশ রেখেছিলো, সেটা গত শনিবার েেনপে গন্ধ সরানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। গতকালও তেমন আলামতও পাওয়া গেছে বলে মন্তব্য করেছেন চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) বেলায়েত হোসেন। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে এ মন্তব্য করে বলেন, হত্যার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যেই হত্যাকারীদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করতে সক্ষম হয়েছি আমরা।
আমিনুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গার পল্লি আইলহাসের মৃত মকবুল হোসনের ছেলে। গত ১৩ ডিসেম্বর ঝিনাইদহের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। সন্ধ্যায় তিনি সরোজগঞ্জ থেকে আলমসাধুযোগে ফেরেন বাড়ির অদূরর্তী রায়লক্ষ্মীপুরে। মোবাইলফোনে কথা বলতে বলতে তিনি যান বাগদিবাড়ির দিকে। এরপর থেকেই নিখোঁজ তিনি। পরিবারের সদস্যরা অপহরণের অভিযোগ তোলেন। মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। হদিস না পেয়ে গতপরশু ১৮ ডিসেম্বর আমিনুল ইসলামের মেয়ে ফাতেমা খাতুন মিতা বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় পারলক্ষ্মীপুর বাগানপাড়ার তহির আলীর ছেলে জহুরুল ইসলামকেই বেশি সন্দেহ করার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি আমিনুল ইসলামের নিকট কিছু টাকা পেতেন। সেই টাকা নিয়ে মতবিরোধ ছিলো। মামলা রুজুর পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জহরুলকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। অপরদিকে আমিনুল ইসলামের মোবাইলফোনটি ট্রাকিং করে পুলিশ জানতে পারে, নিখোঁজ হওয়ার দিন অর্থাৎ ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় শেষ কথা হয়েছে শ্রীমতি আভারানীর সাথে। এ সূত্র ধরেই গতপরশু তাকে গ্রেফতার করে আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আভারানী তেমন কোনো তথ্য না দিলেও তার বাড়ির অদূরবতী স্থান থেকে লাশ উদ্ধার এবং তার বাড়ি থেকে লাশের গন্ধ পাওয়ায় পুলিশ নিশ্চিত, ওই আভারানীর বাড়িতে গিয়েই নৃশংসতার শিকার হয়েছেন আমিনুল ইসলাম।
স্থানীয়দের অনেকেই বলেছেন, আইলহাস ইউনিয়নের আইলহাস বাজারের নিকটেই বসবাস করেন প্রায় কুড়ি ঘর আদিবাসী। এদের কেউ বলে বুনো, কেউ বলে বাগদি। এ পরিবারগুলোর নারীদের প্রায় সকলেই যেমন মাঠের কৃষিকাজে পারদর্শী, তেমনই তাদের কয়েকজনকে নিয়ে নানা গুঞ্জন দীর্ঘদিনের। আইলহাসের আমিনুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরেই ওই পরিবারের শ্রীমতি আভার বাড়িতে আসা-যাওয়া করে আসছিলেন। কয়েক দফা ধরে কিছু অর্থও আদায় করেছে স্থানীয় সুবিধাবাদী যুবকেরা। সূত্র বলেছে, বাগদিবাড়িতে যাওয়া পুরুষ ধরে অর্থ আদায়ের জন্য তাদের অনেকেই দিন-রাত ওত পেতে থাকতো। যে আমিনুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে আভারানীর বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন, সেই আমিনুলকে কেন আভারানীরা মারবে? সঙ্গত প্রশ্নের জবাব খুঁজতে পুলিশও নানামুখি উদ্যোগ নিয়েছে।
মৃত মকবুল হোসেনের ৪ ছেলে এক মেয়ের মধ্যে আমিনুল ইসলাম ছিলেন দ্বিতীয়। তার রয়েছে এক ছেলে এক মেয়ে। জামাই প্রবাসী। ছেলে আশিকুর রহমান আলো ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কাঠব্যবসা করে আমিনুল বেশ অর্থশালী। তার আগে তিনি আইলহাস বাজারে রাইস মিল দিয়ে নগদকড়ি কামাতেন। তখনও বাগদি পরিবারের নির্দিষ্ট বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিলো তার। গতকাল অর্ধগলিত লাশ ভুট্টাক্ষেত থেকে উদ্ধারের পর নেয়া হয় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালমর্গে। ময়নাতদন্ত শেষে গতকালই মৃতদেহ নেয়া হয় নিজ বাড়ি। করা হয় দাফনের প্রক্রিয়া।