মাজেদুল হক মানিক: মেহেরপুর গাংনীর আযান-খোকসা সড়ক নির্মানে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের ইট-বালি দিয়ে রাস্তা তৈরিতে বাঁধ সেঁধেছে এলাকাবাসী। কোটি টাকা নির্মাণ মূল্যের এই সড়কটির দরপত্রে উল্লেখিত শর্তানুযায়ী নির্মাণের লক্ষ্যে এলজিইডি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকাবাসী।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দরপত্রের শর্তানুযায়ী উন্নতমানের বালি দেয়ার কথা থাকলেও মাটি মিশ্রিত স্থানীয় বালি দিয়ে রাস্তা নির্মাণ শুরু হচ্ছে। মানসম্মত ইটের পরিবর্তনে নিম্নমানের ইট-খোয়া দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ৬/৭ ঝুড়ি বালির বিপরীতে এক ঝুড়ি খোয়া দিয়েই রাস্তার এজ তৈরি করে চলেছেন ঠিকাদার। অপরদিকে প্রয়োজনীয় পানি ও রুলার দেয়ার হচ্ছে না। আযান গ্রামের প্রতিবাদী কিছু মানুষ কয়েক দিন থেকে এতে বাধা প্রদান করলেও ঠিকাদার বিভিন্নভাবে অপব্যাখ্যা দিয়ে রাস্তা নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছেন। বিষয়টি এলজিইডি গাংনী উপজেলা প্রকৌশলীকে অবহিত করেছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসী।
আযান গ্রাম থেকে সদর উপজেলার খোকসা গ্রামের সড়কটি কাঁচা থাকায় চরম বিপাকে ছিলো এলাকাবাসী। বিশেষ করে আম মরসুমে কাঁদা রাস্তায় গাড়ি লোড ও সবজি নিয়ে বিপাকে পড়েন কৃষকরা। গাড়াডোব থেকে আযান ও খোকসা গ্রামের মধ্যদিয়ে সদর উপজেলার আমঝুপির সাথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে মেহেরপুর জেলার দুটি আসনের দুজন সংসদ সদস্যের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সড়কটি পাকাকরণের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। নির্মাণকাজ শুরু হলে এলাকাবাসী দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
এলজিইডি গাংনীসূত্রে জানা গেছে, আযান-খোকসা সড়কটির ২ হাজার ৩৩৫ মিটার (২ দশমিক ৩ কিলোমিটার) পাকাকরণে প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৮ টাকা। চুয়াডাঙ্গার মেসার্স শাহানা কনস্ট্রাকশন নামীয় লাইসেন্সে টেন্ডার পান মেহেরপুরের ঠিকাদার তারেক মিয়া। রাস্তা নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে ১ কোটি ৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৯০ টাকার চুক্তি করা হয়েছে। গত ২৩ মার্চ নির্মাণকাজ শুরু হয়। দরপত্রের চুক্তিনুযায়ী আগামী ২২ আগস্ট নির্মাণ কাজ শেষ হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাকাকরণের লক্ষ্যে বেশ কিছুদিন আগে থেকে খোড়া হয়। এরপরে বালি ফেলা হয়। কিন্তু বালির সাথে মাটি মিশ্রিত পাওয়া গেছে। উন্নতমানের বালি ব্যবহার করা হচ্ছে না। তাছাড়া গ্রামবাসীর সুবিধার্থে আযান গ্রাম থেকে খোয়া ফেলার কাজ শুরুর দাবি থাকলেও ঠিকাদার রাস্তাটির শেষ মাথা থেকে কাজ শুরু করেছেন। মাঠের মধ্যে নির্জন স্থানে কাজ শুরু করায় গ্রামের মানুষের নজরদারি কম। এ সুযোগে তিনি পরিমাণ মতো পানি, বালি ও খোয়া না দিয়েই রুলার করে এজ তৈরি করছেন।
সরেজমিন সড়কটিতে গিয়ে গ্রামবাসীর অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। রাস্তার দু পাশে খাড়া করা ইট (এজিং) এক নম্বর দেয়ার কথা থাকলেও তিন নম্বর কিংবা নিম্নমানের ইট ফেলা হয়েছে। এতে নির্মানের পর যানবাহন চলাচল করলেই সড়কটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছে এলকাবাসী। অপরদিকে এজ তৈরিতে যে খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিম্নমানের। নির্মাণকাজ চলার সময় একজন উপসহকারী প্রকৌশলী উপস্থিতি নিশ্চিত করার শর্ত থাকলেও কার্যত তা চোখে পড়েনি। নির্মাণকাজে দরপত্রে উল্লেখিত শর্ত লঙ্ঘন করে পুকুর চুরির মধ্যদিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আযান গ্রামের অনেকেই। ঠিকাদার তারেকের ইচ্ছেমতো নির্মাণসামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হলেও তিনি গ্রামবাসীর কাছে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছেন। এ কাজের মধ্যদিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের দুর্নীতি করবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গ্রামবাসী।
আযান গ্রামের সিরাজুল ইসলামসহ প্রতিবাদী কয়েকজন বলেন, এজ তৈরিতে ভালো খোয়ার পরিবর্তে আমা জাতীয় খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। বালি ও খোয়ার মিশ্রণ পরিমাণের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ফারাক। এক ঝুড়ি খোয়ার বিপরীতে ৬/৭ ঝুড়ি বালি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু শর্তনুযায়ী বালি ও খোয়ার পরিমাণ সমান হবে। গত রোববার দুপুরে তারা রাস্তায় কোদাল দিয়ে কুপিয়ে খোয়ার পরিমাণ তেমন পাননি। শুধু বালি দিয়েই দ্রুত কাজ শেষ করার পাঁয়তারা করছেন ঠিকাদার তারেক।
আযান গ্রামের বাসিন্দা ও গাংনী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক আবুল বাসার জানান, বিষয়টি উপজেলা প্রকৌশলীকে অবহিত করা হলেও তিনি কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ঠিকাদারের কাছ থেকে উপরি নিয়ে চুপ রয়েছেন তিনি। দুয়েক দিনের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা না হলে তিনি কাজ বন্ধ করে দেবেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করবেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার তারেক। তিনি বলেছেন, তিন নম্বর ইট নয়, কিছু কিছু দুই নম্বর ইট দেয়া হয়েছে। বাকিটা সব ঠিকঠাক হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে সরজমিন নির্মাণকাজ পরির্দশন করা হবে বলে জানান, এলজিইডি গাংনী প্রকৌশলী এএইচএম রবিউল আওয়াল রিজভী। তবে ঠিকাদার তারেককে দুর্নীতির বিষয়ে মৌখিক সতর্ক করে দরপত্রে উল্লেখিত শর্তানুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।