রাজধানীসহ দেশের ১৬ জেলায় বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার সাথে বজ্রপাত
স্টাফ রিপোর্টার: বোশেখের শেষ ভাগে এক সপ্তাহ গরমের পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীসহ দেশের অনেক জেলায় বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এর সাথে হয় বজ্রপাতও। বৃষ্টিতে স্বস্তি এলেও দেশজুড়ে বজ্রপাত কেড়ে নিলো ৪১ তাজা প্রাণ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরাসহ কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জে, নাটোর, পাবনা, নেত্রকোনা, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়া, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব নিহতের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পৃথক ঘটনায় হতাহতের এসব ঘটনা ঘটে। বিলুপ্ত সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সুজিত কুমার দেবশর্মা জানান, কালবোশেখি মরসুমে বজ্রঝড় বেশি হয়। সাধারণত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বজ্রঝড় হয়ে থাকে। বর্ষাকালের পর কখনও কখনও অক্টোবর-নভেম্বর মাসেও তা দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে দুই থেকে তিনশ’ মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে জানান তিনি।
আবহাওয়ার এই প্রপঞ্চের কারণ ব্যাখ্যা করে সুজিত দেবশর্মা বলেন, যখন কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়, তখনই বজ্রঝড় হয়ে থাকে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ হচ্ছে খাড়াভাবে সৃষ্টি হওয়া বিশাল আকৃতির পরিচালন মেঘ যা থেকে শুধু বিদ্যুৎ চমকানো নয়, বজ্রপাত-ভারি বর্ষণ-শিলাবৃষ্টি-দমকা-ঝড়ো হাওয়া এমনকি টর্নেডোও হতে পারে। বায়ুমণ্ডলে বাতাসের তাপমাত্রা ভূভাগের উপরিভাগের তুলনায় কম থাকে। এ অবস্থায় বেশ গরম আবহাওয়া দ্রুত ওপরে উঠে গেলে আর্দ্র বায়ুর সংস্পর্শ পায়, তখন গরম আবহাওয়া দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে বজ্রমেঘের সৃষ্টি হয়।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলে ৩৭ মিলিমিটার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। চুয়াডাঙ্গার আকাশে মেঘের ঘনঘটা, গুড়গুড় শব্দে বারীঝরানোর পরিবেশ গড়ে উঠলেও মাটি ভেজেনি। তবে বাতাসে এসেছে শীতলতা। তাতে কারোরই আর অনুমান করতে বাকি থাকেনি, আশেপাশে বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নেত্রকোনা, কুমিল্লা, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, বগুড়া, বদলগাছী, তাড়াশ, রংপুর, দিনাজপুর, রাজাহাট, ভোলা ও পটুয়াখালীতে বৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে মংলা ও যশোরে ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্র ছিলো ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোনিন্ম তাপমাত্র ছিলো ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় তাপপাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিলো। শুক্রবারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের দুয়েক জায়গায় দমকা-ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
ঢাকা: ঢাকা মেডিকেল কলেজ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বেলা ৪টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলার সময় বজ্রপাতে রাজধানীর ডেমরার কাঠেরপুল এলাকায় কলেজ ছাত্র তাহসান লিংকন (২১) ও শাহেদ (২১) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় রায়হান (১৮) নামে আরেক কলেজ ছাত্র আহত হয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে নারী-শিশুসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- রায়গঞ্জ উপজেলার চকপুর গ্রামের নুর নবীর শিশু কন্যা নুপুর খাতুন (৮), বৈকণ্ঠপুর গ্রামের দারুজ্জামানের ছেলে আব্দুল মোতালেব (৪২), একই উপজেলার বেতগাতী গ্রামের বাসিন্দা এবং রায়গঞ্জের হাসিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন (৪৫), উল্লাপাড়া উপজেলার শিমলা গ্রামের আব্দুল লতিফ (৩৫) ও বেতুয়া গ্রামের গৃহবধু শাহিনুর বেগম (৩০)। এর মধ্যে বৈকুণ্ঠপুর এলাকায় বজ্রপাতে দুটি গরুও মারা গেছে।
কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর ও বাজিতপুর উপজেলায় বজ্রপাতে কলেজছাত্র শরীফুল ইসলাম শুভ (১৮) ও শ্রমিক স্বপন মিয়া (২০) মারা গেছেন। নিহতরা হলেন-বাজতিপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের কাইকড়ি গ্রামের আবু বক্করে স্ত্রী রিজিয়া বেগম (৫৬), দিলালপুর ইউনিয়নের বাহেরনগর এলাকার মঞ্জু মিয়ার ছেলে স্বপন মিয়া (২০), তাড়াইল উপজেলার জাওয়ার ইউনিয়নের আব্দুর কুদ্দুসের স্ত্রী মমতা বেগম (৪৫) ও হোসেনপুরের আড়াইবাড়িয়া গ্রামের রহমত আলীর ছেলে শরীফুল ইসলাম শুভ (১৮)। তিনি হোসেনপুর ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র।
নরসিংদী: নরসিংদী সদর ও রায়পুরায় বজ্রপাতে নারী-পুরুষসহ ৩ জন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- রায়পুরা উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের ফকিরেরচর গ্রামের জোছনা বেগম (৩৮), নরসিংদী সদর উপজেলার মহিসাষুরা গ্রমের কৃষক আব্দুল করিম (৫০) ও নজরপুরের চরাঞ্চলের গৃহবধূ ফুলি বেগম (৩২)। আহতরা হলেন- তায়েব আলী (১৭) ও মেহর বেগম (৪০)।
পাবনা: পাবনার আমিনপুরের পৃথক স্থানে বজ্রপাতে ৪ জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- ইউনিয়নের আহম্মদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণচর গ্রামের মৃত রইছ সরদারের ছেলে শহীদ সর্দার (৫৮), সোনাতলা গ্রামের ইউসুফ সেখ ওরফে এছো সেখের ছেলে হীরা (১৩), বাঘলপুর গ্রামের ময়েন সরদার (৬৫) ও তার নাতনী মৃত শিরু সরদারের মেয়ে শিখা খাতুন (১৩)।
রাজশাহী: বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে মোহনপুরের ঘাষিগ্রাম ইউনিয়নে দুপুরে বৃষ্টির সময় মাঠে কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে আজিজ ও সত্যচন্দ্র মারা যান। আব্দুল আব্দুর রাজ্জাক নামের আরেকজন নিজ বাড়িতে বজ্রপাতে নিহত হন।
মোহনপুরে বজ্রপাতে আহতরা হলেন- পোল্লাকুড়ি গ্রামের জালাল উদ্দিন, বারইপাড়া গ্রামের আব্দুর রহিমের স্ত্রী আলিমন বেগম ও মোল্লা ডায়িং গ্রামের ছমির উদ্দিনের স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং বাগমারার ধামিনপুর গ্রামের রহিমা বেগম।
হবিগঞ্জ: জেলার বানিয়াচংয়ের হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন কৃষক হাবিব মিয়া (৩০)।
নীলফামারী: বৃহস্পতিবার দুপরে কিশোরীগঞ্জ উপজেলার ফুলের ঘাট গ্রামে নিজ বাড়ির রান্নাঘরে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন দুই সন্তানের জননী লালবিবি।
নেত্রকোনা: জেলার পূর্বধলা উপজেলায় বজ্রপাতে রুবেল মিয়া (২৫) নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার বিশকাকুনী ইউনিয়নের ধোবারুহী গ্রামের আবদুল বারেকের ছেলে। এ সময় রুবেলের চাচি রেজিয়া আক্তার বজ্রপাতে আহত হন।
আর জেলার কেন্দুয়া উপজেলায় বজ্রপাতে রইছ উদ্দিন নামে এক কৃষক নিহত হয়েছেন।
নাটোর: নাটোরের লালপুরে এক নারীসহ দু’জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অপর এক নারীসহ দুজন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- উত্তর লালপুরের বান্টু আলীর স্ত্রী সাহারা বানু ও রঘুনাথপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোবারক আলী (৩০)। আহতরা হলেন- মোহরকয়া গ্রামে আব্দুস সালামের স্ত্রী পাপিয়া খাতুন (২৫) ও কাজীপাড়ার মোহাম্মদ আলীর ছেলে সাজেদুল ইসলাম।
গাজীপুর: গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বজ্রপাতে এক কৃষি শ্রমিক ও গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার সাতানা গ্রামের সানাউল্লাহ বেপারীর ছেলে মো. সাত্তার আলী (২৬) ও কাপাসিয়ার খিরাটি গ্রামের কাজল মিয়ার স্ত্রী রুবিনা (৪০)।
নওগাঁ: জেলার আত্রাইয়ে বজ্রপাতে জয়নাল উদ্দিন (৬৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার বিষা উত্তর গ্রামের মৃত ব্যাঙ্গা প্রামাণিকের ছেলে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় বজ্রপাতে তিনজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- উপজেলার চরশিবপুর গ্রামের সফিকুল ইসলাম, ইছাপুর গ্রামের সামছুল ইসলাম ও কানাইনগর গ্রামের কবির হোসেন।
দিনাজপুর: দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বজ্রপাতে মঙ্গল মুর্মু (৫০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি বাসুবেদপুর গ্রামের মৃত উমান মুর্মুর ছেলে।
পিরোজপুর: জেলার মঠবাড়িয়ায় ভারী বর্ষণের সময় বজ্রাঘাতে ইউনুস সিকদার (৫৫) নামে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। এ সময় নিহত কৃষক ইউনুসের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী গৃহবধূ আয়েশা বেগম (৪৫) আহত হন।