গড়ে উঠুক গণতন্ত্র ও সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি

অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপমহাদেশের দুটি নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো অনেকেরই। এর একটি হলো প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন, অন্যটি বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের বিহার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। মিয়ানমারে দীর্ঘ ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে অবাধ এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে এবং ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে। দেশটির নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোট প্রদানের হার শতকরা ৮০ ভাগ। টেলিভিশনেও দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছে মিয়ানমারের জনগণ। নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জয় পেয়েছেন। নির্বাচনে আগাম পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক পার্টির (ইউএসডিপি) চেয়ারম্যান। এ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরে আসবে কি-না, তা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু নির্বাচনের সার্বিক আয়োজন নিয়ে কোনো পক্ষের কাছ থেকে বড় ধরনের কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, এটি লক্ষ্য করার বিষয়। তবে আমরা আশা করি অবশ্যই নির্বাচনে বিজয়ী দলই মিয়ানমারে সরকার গঠন করবে এবং দেশটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসবে।

অন্যদিকে ভারতের বিহারের বিধানসভার নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো নানা কারণে। ভারতে গত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হয় ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট। ওই নির্বাচনে বিহারের ৪০টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৩১টিতেই জয়ী হয়েছিলো বিজেপি। কিন্তু জোটের কোনো কোনো শরিক দলের সাম্প্রতিক কিছু আচরণ ভারতজুড়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। বৃদ্ধি পায় ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিহারের বিধানসভা নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী জোট বিপুলভাবে জয়ী হয়েছে। রাজ্যে ২৪৩ আসনের বিধানসভায় লালুপ্রসাদ যাদব ও নীতিশ কুমারের মহাজোট পেয়েছে ১৭৮টি আসন, আর ক্ষমতাসীন বিজেপি জয়ী হয়েছে মাত্র ৬০টি আসনে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। পরাজিতদের পক্ষ থেকে কোনো রকম আপত্তি তোলা হয়নি। বরং ফল ঘোষিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোন করে নীতিশ কুমারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

বস্তুত এটিই প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নির্বাচন হলো গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম একটি দিক। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে। মানুষ যাকে খুশি ভোট দেবে। যে দল বা প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, সে দল বা প্রার্থী বিজয়ী বলে ঘোষিত হবেন। বিজিত দল বা প্রার্থী পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী দল বা প্রার্থীকে অভিনন্দন জানাবেন। এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিক। এর বিপরীতে আমাদের দেশে কী ঘটছে? এখানে নির্বাচন আয়োজকদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একদফা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নির্বাচন হওয়ার পর আরেক দফা প্রশ্ন তোলা হয় এর নিরপেক্ষতা নিয়ে। আনা হয় কারচুপির অভিযোগ। স্বভাবতই বিজিত দল কর্তৃক বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানানোর রেওয়াজও এখানে অনুপস্থিত। প্রতিবেশীদের নির্বাচনে গণতন্ত্র ও সহিষ্ণুতার দিকটি আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। রাজনীতিতে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা সেখানেও আছে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। জনগণের রায়ই চূড়ান্ত। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশেও নির্বাচনকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।

Leave a comment