গৌরব হারাচ্ছে সংসদ, অপচয় হচ্ছে অর্থের : আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না

 

বহুল আলোচিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। আবার দশম সংসদের যে নৈতিক ভিত্তি দুর্বল সে কথাও স্বীকার করতে হবে- বিশেষজ্ঞরা এমনটিই মনে করেন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা-সমালোচনার কমতি নেই। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় বিদেশি পর্যবেক্ষকদেরও দেখা যায়নি নির্বাচনে। এরপরও নির্বাচন শেষে সরকার গঠিত হয়েছে। আবার নবম সংসদে বিরোধীদলের লাগাতার অনুপস্থিতির কারণে বলা যায় নবম সংসদও বিরোধীদলহীন চলেছে। বিরোধীদলহীন সংসদ মানে ‘বিরোধী দল’ না থাকার মতোই অবস্থা। সংসদে বিরোধীদলের উপস্থিতি না থাকলে সংসদ কোরাম জটিলতায় পড়ে এটা বাস্তবতা। রাষ্ট্রেরও বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় ঘটে, যার পরিমাণ আঁতকে ওঠার মতোই। সম্প্রতি এমনই এক আতঙ্কের খবর দিয়েছে টিআইবি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে, যা গতকালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেশের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি নিঃসন্দেহে সরকারকেই আমলে নিতে হয়। প্রতিবেদন মতে, নবম জাতীয় সংসদের ১৯ অধিবেশনে ৪১৮ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধীদল ৩৪২ দিন সংসদ বর্জন করেছে। তাদের সংসদ বর্জনের মোট অর্থমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এছাড়া কোরাম সঙ্কটে সময় নষ্ট হয়েছে ২২২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট। কোরাম সঙ্কটের অর্থমূল্য ১০৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যবেক্ষণমূলক এ গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে হয়তো সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মহলের মতামত রয়েছে, তবু আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সত্য যে বিরোধীদলের সংসদ বর্জন বাংলাদেশের মতো বিশ্বের আর কোনো দেশে দেখা যায় না। এটি যেমন জাতীয় উন্নতির ক্ষেত্রে অন্তরায় তেমনি দেশের জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতার পরিচায়ক। বিরোধীদলের অনুপস্থিতিতে সংসদ ক্রমেই অচল হয়ে পড়ে। সরকারি দলও কোনোরকম জবাবদিহিতা ছাড়া বা বাধাহীনভাবে যে কোনো বিল বা আইন পাসের সুযোগ পায়, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যাশিত নয়। সংসদ হচ্ছে জনগণ ও দেশের উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা নেয়ার জায়গা। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখানে বসে আইন পাসসহ জনগণের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। অথচ সংসদে অনুপস্থিতির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এতে রাষ্ট্র যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি গৌরব হারাচ্ছে সংসদ, অপচয় হচ্ছে অর্থের- টিআইবির তথ্য এমনই। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে সমালোচনা করেছেন। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এক প্রতিক্রিয়ায় ‘জাতীয় সংসদ কার্যকর নিয়ে টিআইবির প্রকাশিত প্রতিবেদন পক্ষপাতমূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন। টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিকমহলের নানা মত থাকতেই পারে কিন্তু বিগত সংসদে সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতি এবং এ নিয়ে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। আমরা লক্ষ্য করেছি, রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থেই সংসদ সদস্যরা সংসদে অনুপস্থিত থাকেন। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় ফলে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হলে তা অবশ্যই বিবেচনায় নেয়ার দাবি রাখে। এ বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্র পরিচালকদেরই নিতে হবে।
টিআইবি সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি প্রতিহত করতে আইন প্রণয়ন ও দলীয় বা জোটগতভাবে সংসদ বর্জন নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে। আবার সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয়ে গণভোট আয়োজনেরও সুপারিশ করেছে। সংসদ কার্যকরের জন্য সংস্থাটির সুপারিশের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই যে জাতীয় সংসদ কার্যকর হচ্ছে না, তা বহুভাবে উচ্চারিত। এছাড়া কার্যকর সংসদের জন্য শক্তিশালী বিরোধীদলেরও কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করতে না পারলে দেশে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, এটিও সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে। দেশ ও জনগণের বৃহৎ স্বার্থে সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।