ভুয়া নিবন্ধন সনদে শ শ শিক্ষক এমপিওভুক্ত

 

স্টাফ রিপোর্টার: সারাদেশের শ শ বেসরকারি শিক্ষক ভুয়া নিবন্ধন সনদে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা) শিক্ষকতার জন্য নিবন্ধন সনদ আবশ্যিক। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) প্রতি বছর একবার নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে থাকে। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই কেবল নিবন্ধন সনদ পান। দেখা গেছে, নিবন্ধন পরীক্ষায় ফেল করার পর শ শ শিক্ষক ভুয়া নিবন্ধন সনদ জোগাড় করে সরকারি এমপিওভুক্ত হচ্ছেন। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছে এনটিআরসিএ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মচারী। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা প্রতি বছর গচ্চা যাচ্ছে। সনদ জালিয়াতির মাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ভুয়া সনদধারী শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কতো টাকা বেতন-ভাতা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান মাউশিতে নেই।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, জালসনদে শিক্ষকতার মহান পেশায় থাকা চরম অনৈতিকই শুধু নয়, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযুক্তরা রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করছেন। তাদের ব্যাপারে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই শুধু সনদ জালিয়াতির মতো ঘটনা বন্ধ করা যাবে। অনুসন্ধানে জালসনদ দিয়ে চাকরি নেয়া এ রকম শ শ শিক্ষকের তালিকা পাওয়া গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর (ডিআইএ) ও এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের পৃথক তদন্তে এসব শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ পুরোপুরি জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। আবার ডিআইএর তদন্তে সনদ জাল করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখা থেকে ছেড়ে দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। অভিযোগ উঠেছে, এ কাজে লাখ লাখ টাকা হাতবদলের ঘটনা ঘটেছে। এমনই ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার শিয়ালদী আদর্শ আলিম মাদরাসার ক্ষেত্রে।

ডিআইএর সরজেমিনে তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মাদরাসার সহকারী শিক্ষক (কৃষি) মো. হাসান মৃধা ২০১০ সালের ১৯ জুলাই চাকরিতে যোগ দেন। সে সময় তিনি ২০০৯ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করেছেন মর্মে দাবি করেন ও সনদপত্র প্রদর্শন করেন। তদন্তকালে সন্দেহ হলে ডিআইএ কর্তৃপক্ষ তার সনদ এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাছে যাচাই করতে পাঠায়। এনটিআরসিএর উপপরিচালক দীনা পারভীন এক চিঠিতে জানান, মো. হাসান মৃধার নিবন্ধন সনদটি জাল। ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়, জাল সনদের কারণে এ শিক্ষক এমপিওভুক্ত হওয়ার যোগ্য নন। তারপরও তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত হয়ে ২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তদন্তকাল পর্যন্ত ৮ হাজার টাকার স্কেলে সর্বমোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৫৯ টাকা ৬৬ পয়সা বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। তার কাছ থেকে এ টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার জন্য গভর্নিং বডিকে নির্দেশ দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চাওয়া হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২২ ডিসেম্বর এ শিক্ষককে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখা। অব্যাহতির কারণ সম্পর্কে বলা হয়, এনটিআরসিএ তার সনদটি সঠিক বলে প্রত্যয়ন করেছে। অথচ এনটিআরসিএ ঠিক উল্টোটিই বলেছে। জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অডিট) মো. রফিকুজ্জামান এভাবে বহু জালসনদধারী শিক্ষককে অনৈতিকভাবে রেহাই দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মো. রফিকুজ্জামান গতকাল সোমবার দুপুরে বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন। তবে তার শাখার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ধরনের কাজে জড়িত থাকলে তিনি অবশ্যই খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বলেন, জাল সনদ দিয়ে এমপিওভুক্ত হলে তার বেতন বন্ধ ও আগের নেয়া সমুদয় অর্থ ফেরত নেয়া হবে।

ভুরি ভুরি ভুয়া সনদ: এনটিআরসিএর নিজস্ব তদন্তে ধরা পড়া জাল সনদের প্রমাণও ভুরি ভুরি। ধরা পড়া এ শিক্ষকদের সবাই এমপিওভুক্ত। সারাদেশের এমন শ শ শিক্ষকের নাম ও রোল নম্বর পাওয়া গেছে। যেমন সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) নিগার সুলতানা (রোল-১০৭২৫০৫৮), সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) মোহাম্মদ জাকারিয়া (২০২৪৮৭৬১), সহকারী শিক্ষক (গণিত) জাহাঙ্গীর আলম (১০৭১৮০৫২), জুনিয়র মৌলভী ফাতেমা আক্তার (৩৪১২০২৩৪), সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন (৩১১১৫২৩৬), সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) সাখাওয়াত হোসেন (৩২১১০৯০১), সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) ইদ্রিস আলী শেখ (৩১৩১৫৬৫০), সহকারী শিক্ষক (হিন্দুধর্ম) যশোদা বালা দেবীসহ (১১১৯০২৮৮) আরও বহু শিক্ষক জালসনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। এসব ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান আশীষ কুমার সরকার বলেন, সনদ জালিয়াতি ঠেকাতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এরপরও তারা সফল হচ্ছেন, এমনটি বলা যাবে না। তিনি জানান, তারা সনদের কাগজের মান উন্নত করা, সনদের সিকিউরিটি বাড়ানো ও সর্বশেষ বার কোড সিস্টেম সংযোজন করেছেন। পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্রেও বার কোড চালু করা হয়েছে। আশীষ কুমার আরও বলেন, তারা ডালে ডালে চললে জালকারীরা চলে পাতায় পাতায়।

একইভাবে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমীর (এনএসিটিএআর) ভুয়া সনদ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত হিসেবে চাকরি করেছেন অনেক শিক্ষক। তারা হলেন- আনিসুর রহমান (সনদ নং-১০০২৩), রবিউল ইসলাম (১৮৯২৪), তাপস কুমার বিশ্বাস (৯৭১০), এসএম আশরাফুল আলম (১০৫০), মাহবুবুর রহমান (০০৮০), আবদুল হাই (১৮৫৬৩), মো. আবদুল মান্নান (৭১২৭), রুবী খানম (১০৪৮), খন্দকার মাসুদুর রহমান (৫০৩৫), রওশন আরা খাতুন (১৬৫৭৬), জিয়াউর রহমান (৪১৭০), দীলিপ কুমার বর্মণ (১৭৫৮১), মাসুমা জাহান (৬৭২), মো. জসীমুদ্দিন (৩১৫০), মো. আশরাফুজ্জামান (১৮৩৩৭), ফৌজিয়া সুলতানা (০০৫৮), দিলরুবা আফরোজ (৪১৫৭), রহিমা বেগম (০২০৬), মনিরাজ সুলতানা (১২৭), আফরোজা সুলতানা (১২৮), লিয়াকত আলী (১৯৭৭), মো. হারুন অর রশীদ (১৯৭৮), আম্বিয়া খাতুন (১৮১৮৯), মাহমুদা সুলতানা (১৯৪৮০), মিসেস লিপিকা খাতুন (৯৩০৩), মাহামুদা খাতুন (১৭২২৫), জিয়াউর রহমান (৪১৭০) এবং মো. আবদুল ফকির (১৭৮৭৭)।

সনদ জালিয়াতির মচ্ছব: খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ শ শিক্ষক ভুয়া এনটিআরসিএর সনদ দিয়ে এমপিওভুক্ত হয়ে চাকরি করছেন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সাতগিরি দাখিল মাদরাসার সুপার ভুয়া নিবন্ধনে নিজ পুত্র ও পুত্রবধূকে চাকরি দেয়ায় নিজের চাকরি হারিয়েছেন।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার হোসেনাবাদ ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার বেশ কয়েকজন শিক্ষক ভুয়া নিবন্ধন সনদ নিয়ে চাকরি নেন। পরে তারা জেলা শিক্ষা অফিসের তদন্তে ধরা পড়েন। এ শিক্ষকরা হলেন- মো. কামরুল হাসান, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, মোছা. সুরাইয়া বেগম ও মো. এহছানুল ইসলাম প্রধান। তাদের মধ্যে প্রথম দু’জন এমপিওভুক্ত হয়ে সরকারি বেতন-ভাতাও ভোগ করছিলেন। পরে এসব শিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। একই উপজেলার সাকোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মোছা. আরজুমান আরা বেগম ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার প্রধানপাড়া দারুল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসার মোছা. ডেজিনা আক্তারের নিবন্ধন সনদও সরকারি তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হয়।কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার কাজলা আলিম মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ওমর ফারুক এবং আরবি বিভাগের প্রভাষক মো. শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধেও ভুয়া নিবন্ধন সনদ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের সরকারি বেতন বন্ধ হয়েছে।

শিক্ষকদের একাধিক সূত্র জানায়, নিবন্ধন পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষকদের সাথে এনটিআরসিএর একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে তাদের ভুয়া সনদ সরবরাহ করছে। আর মাউশির একটি অসাধুচক্র অনৈতিক পন্থায় ভুয়া সনদধারী শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করছে। গত বছর এনটিআরসিএর সনদ জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৬৪ জেলা প্রশাসক এবং সব জেলা শিক্ষাকর্মকর্তাকে চিঠি দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ পরে আর লক্ষ্য করা যায়নি।

মাউশি ডিজির বক্তব্য: মাউশির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আতাউর রহমান গতকাল সোমবার বলেন, এনটিআরসিএর একটি চক্র শিক্ষকদের ভুয়াসনদ গছিয়ে দিচ্ছে। এমপিওভুক্ত করার সময় কারও সনদ নিয়ে সন্দেহ হলে তা এনটিআরসিএতে পাঠানো হয়। তবে ওই চক্রের কারণে সঠিক সময় প্রতিউত্তর মেলে না। তিনি জানান, নিবন্ধন সনদজাল প্রমাণিত হলে তারা সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে শোকজ করেন। তবে এমপিও বাতিল করতে পারেন না। এমপিও বাতিল করার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের।