বাল্যবিয়ের ভয়াবহ পরিসংখ্যান : দরকার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ

তথ্যটি চমকে ওঠার মতোই। এক বছরে একটি বিদ্যালয়ের ২৯ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার। বিদ্যালয়টিতে মোট ছাত্রী কতো? প্রায় ৫শ। যার অর্ধেক একেবারেই শিশু। বাকি অর্ধেক যদি ওই হারে বাল্যবিয়ের শিকার হতে থাকে তাহলে সমাজে বাল্যবিয়ের চিত্রটা কতোটা ভয়াবহ তা বোদ্ধাদের কাছে বোধ করি অস্পষ্ট নয়। বিষয়টি দায়িত্বশীলদের উপলব্ধিতে নিয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ দরকার।
বাল্যবিয়ে রোধে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রশাসনও সোচ্চার। এরপরও অপ্রাপ্ত বয়সে মেয়েদের বিয়ের আসনে বসানো বা বসতে বাধ্য করা হচ্ছে কেন? অভিভাবকদের চেতনায় ঘাটতির পাশাপাশি পূর্বেই শনাক্তকৃত পরিবেশগত কিছু সমস্যা দূর করতে না পারাটাও কম দায়ী নয়। অবশ্য আইন প্রয়োগে প্রশাসনের বিশেষ তৎপরতা, সমাজের সচেতন অংশের বাড়তি নজরদারি ও এনজিও কর্মীদের কর্তব্যপরায়ণতা বাল্যবিয়ের হার হ্রাসে অনেকটাই সহায়ক হয়েছে। কাজি আর জনপ্রতিনিধিদের শতভাগ সৎ ও স্বচ্ছতার সাথে কর্তব্যপরায়ণ করতে পারলে পরিস্থিতিটা প্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছুতে খুব বেশি দেরি হতো না।
পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গার জেহালা ইউনিয়নের সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের ছাত্রীদের মধ্যে এক বছরেই ২৯ ছাত্রীর অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের আসনে বসতে হয়েছে। বিয়ের পর তালাকও হয়েছে ১০ নাবালিকা বধূর। আর জেহালা ইউনিয়নেরই এক কাজি ৪ বছরে ৩০৪টি বিয়ে সম্পাদন করেছেন। নিজের হাতেই তালাকও লিখেছেন তিনি ১১২টি। কাজিদের বার বার বলা হয়, বিয়ের সময় বর-কনের জন্মসনদ দেখতে হবে। কাজিরা দেখেনও। ওই জন্ম সনদের সাথে বাস্তবের মিল নেই। তা হলে জন্মসনদ কোন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া হয়? জনপ্রতিনিধিদের অনেকেরই সরল স্বীকারোক্তি- ভোটের রাজনীতি করি, ভোটের আশায় ওরকম দু একটি অন্যায় আবদার তো মানতেই হয়।
একদিকে ভোটের আশায় আইনকে অবজ্ঞা মনগড়া জন্মসনদ প্রদান, অন্যদিকে অভিভাবকদের অসচেনতার পাশাপাশি উত্যক্তকারীর উৎপাত। অবশ্যই এসবের কাছে প্রশাসনের আত্মসমর্পণ করলে চলবে না। সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী সুন্দর করতে হলে বাল্যবিয়ে রোধ অপরিহার্য। অপ্রাপ্ত বয়সে অর্থাৎ ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়েকে বিয়ের আসনে বসানো মানে নিজের হাতেই নিজের সন্তানকে অসুখি দাম্পত্যের দিকে ঠেলে দেয়া। তার চাক্ষুস প্রমাণ একটি বিদ্যালয়ের মাত্র এক বছরের পরিসংখ্যান। ২৯টি বাল্যবিয়ের টিকেছে ১৯টি। এ ১৯টি দাম্পত্য সম্পর্কে আশু খোঁজ নিতে গেলে যে চিত্র পাওয়া যাবে তা কোনো অভিভাবকের জন্যই সুখকর নয়।
উত্ত্যক্তকারী সমাজেরই কারো না কারো সন্তান। তাকে সুপথে রাখার দায়িত্ব যেমন অভিভাবকের তেমনই সমাজের সচেতন মহলেরও। অবশ্যই অভিভাবকদের উদাসীনতায় উত্ত্যক্তকারীদের উৎপাত বৃদ্ধি পায়। তা নিবৃত করতে পুলিশকে হতে হবে আন্তরিক। জনপ্রতিনিধিদের ভোটের আশায় অন্যায় থেকে বিরত থাকতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে কাজি, জনপ্রতিনিধিসহ বাল্যবিয়ে সম্পাদনে সংশ্লিষ্টদের উপযুক্ত শাস্তি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *