সমাজ থেকে বিশ্বাস উবে গেলে বাকি থাকে কী?

 

জগতে যতোজন প্রতারিত হয়েছে বা ঠকেছে তার সিংহভাগই লোভে পড়ে। ঠকবাজ প্রতারকচক্রের প্রধান দুটি অস্ত্র হলো- লোভ আর বিশ্বাস। এ দুটো অস্ত্রকে যারা কাজে লাগিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়, তারা মূলত সরলসোজা মানুষগুলোকে বোকা ভাবে। ভাববেই বা না কেন? লোভে পড়েই প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছে অসংখ্য মানুষ। টাকা হারিয়ে হাই হাই, আমার কী হলো বলে হা-হুতাশ করছেন। কেউ কেউ লজ্জা লুকোতে প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বেমালুম অস্বীকারও করছেন। এরা কারা? এদেরকে কী শুধু সরলসোজা বলা যায়? সরলসোজার পাশাপাশি ওরা কি লোভী নয়?

 

স্থান ও কাল-পত্র বিবেচনায় যারা ভুল করে তাদেরকে অবশ্য নানা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়। তাই বলে মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করবে না? সমাজ থেকে বিশ্বাস উবে গেলে বাকি থাকে কী? পদে পদে যখন প্রতারিত হওয়ার শঙ্কা, যখন আকেবাকে ওত পেতে অসংখ্য প্রতারক তখন সমাজে বিশ্বাস বলতে কিছু কী থাকে? সামান্য অসতর্ক হলেই যখন প্রতারিত হওয়ার ভয়, তখন যেকোনো প্রস্তাবই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচাল সৃষ্টি করে। বিশ্বাস করে ঠকাটাই বর্তমান বিবেচনায় বোকামি। এ কারণে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতেই হয়, হয়রে দুনিয়া।

মোবাইলফোনে জিনের বাদশা সেজে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে। সোনার গুহার সন্ধান দেয়ার কথা বলে ডেকে বেমালুম সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ার উদাহরণ দিন দিন বাড়ছে। মোবাইলফোনে লটারিতে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়ার কথা বলে মোবাইলফোনের মাধ্যমেই কাড়ি কাড়ি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকরা। মহিলা সঙ্গীকে স্ত্রী সাজিয়ে রাস্তার মোড়ে, হাট-বাজারে বা বাসস্ট্যান্ডে কিংবা স্টেশনে বিপদে পড়ার কথা বলে আশ্রয় নিয়ে আশ্রয়দাতার পরিবারের সকলকে কৌশলে ওষুধ সেবন করিয়ে অচেতন করিয়ে মূল্যবান মালামাল হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিচ্ছে সঙ্গবদ্ধ প্রতারকচক্র। আর বাস-ট্রেন লঞ্চে যাত্রী সেজে প্রতারণার ঘটনা তো প্রতিদিনই ঘটছে। ছোটবড় শহরে প্রকাশ্যে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যৌন এবং জটিল রোগমুক্তির বানোয়াট প্রতিশ্রুতিতে প্রতারণা করা হচ্ছে দেদারছে। পত্রিকার পাতা খুলললেই প্রতারিত হওয়ার নানাপদের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অথচ সমাজের মানুষ প্রতারকচক্রের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না।

 

প্রতারিত হওয়ার আড়ালে শুধুই যে লোভ তা নয়, সরল বিশ্বাসও অনেকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। কালক্রমে সরলতা, মানুষ হয়ে মানুষকে উপকার করার মানসিকতা পরিহার অনিবার্য হয়ে পড়েছে। মানুষ বিপদে পড়লে মানুষই তো সহযোগিতার হাত বাড়াবে। সেই সহযোগিতার মধ্যে অবিশ্বাস থাকলে কি আন্তরিকতা থাকে? যেহেতু পদে পদে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা, সেহেতু বাঙালির সেকেলে আতিথিয়তার ঐতিহ্য এখন অপরিচিতদের ক্ষেত্রে বর্জনেরই তাগিদ দেয়। যদিও প্রকৃত বিপদগ্রস্তদের জন্য এটা ক্ষতিকর। বাঙালির জন্য আত্মঘাতী বটে।

 

স্থান ও কাল-পাত্র বিবেচনা ছাড়া বিশ্বাস করেছো তো ঠকেছো। স্থান অর্থাৎ কোথায়? কাল মানে সময়। আর পাত্র অর্থ হলো ব্যক্তি। কোথায় কখন এবং কে? এ তিনটি বিবেচনায় সর্বদা সতর্ক থাকলে অপদস্থ হওয়ার যেমন ঝুঁকি হ্রাস পায় তেমনই প্রতারিত হওয়ারও ভয় কমে। স্থান ও কাল-পাত্রের পাশাপাশি লোভ পরিহারই পারে প্রতারিত হওয়া থেকে মুক্ত করতে। সকলকে সকল সময়ই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরও কর্তব্যপরায়ণ হওয়া দরকার। ছদ্মবেশে অভিযান ফলপ্রস্যু হতে পারে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *