সমাজ থেকে দূর হোক ওঝা কবিরাজের অপচিকিৎসা

ওঝা কবিরাজের অপচিকিৎসা যেমন নতুন নয়, তেমনই জিন-পরী হাসিলের নামে প্রতারণাও বহু পুরোনো। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বদৌলতে অপচিকিৎসা অনেকটাই দূর হয়েছে। এখনও ওই সমাজে অপচিকিৎসা বিদ্যমান, যে সমাজে সচেতনতার আলো কুসংস্কার নামক অন্ধকার দূর করতে পারেনি। সচেতনতার আলো যতো ছড়াবে ততোই অপচিকিৎসা দূরে সরবে। সে কারণে অপচিকিৎসক কথিত কবিরাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সমাজে সচেতনতার আলো ছড়াতে হবে। দূর করতে হবে দারিদ্র্য। এ জন্য অবশ্যই সমাজের আলোকিত মানুষগুলোকেই অধিক দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

 

শিক্ষিত মানেই কুসংস্কারমুক্ত ধরে নেয়া যায় না। শিক্ষিত অথচ তিনি নিজেই প্রতারণার আস্তানা খুলে বসেছেন। এমন উদাহরণও সমাজে বিদ্যমান। ঝিনাইদহের ভাটুই মোড়ের অদূরের একটি গ্রামে অপচিকিৎসার দোকান খুলে দিব্যি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন যে ব্যক্তি, তিনি একটি বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার মতো ব্যক্তি যখন এ ধরনের আস্তানা খুলে বসেন, তখন কোনো মধ্যবয়সী মহিলা জিন হাসিলের কল্পকাহিনি প্রচার করে চিকিৎসার নামে প্রতারণার আস্তানা খুলতেই পারেন। এসব নীরবে মেনে নেয়া মানে অপচিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে উৎসাহিত করা। আর ওঝা কবিরাজের অপচিকিৎসা? সরল-সোজা মানুষগুলো পুরোনো ভ্রান্ত ধারণার ভরেই ওদের কাছে যায়, অপচিকিৎসার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আধুনিক চিকিৎসার জন্য ছোটেন। যখন চিকিৎসকের কাছে হাজির হন, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনেক দেরি হয়ে যায়। সে সর্পদংশিতই হোক আর হাড়ভাঙার ক্ষেত্রেই হোক। অপচিকিৎসায় অনেকে প্রাণও হারাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপচিকিৎসায় প্রাণ ঝরার খবর ধামাচাপা পড়ে যায়।

 

সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদার মদনা গ্রামের এক কিশোর একই এলাকার কাদীপুর গ্রামের আনিচ নামের কথিত এক কবিরাজের অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে। দরিদ্র পিতার সংগ্রামী কিশোর মাছের ফেরিওয়ালা। মাছ বিক্রি করতে গিয়ে এক ব্যক্তির অনুরোধে আমড়াগাছে উঠে আমড়া পাড়ার সময় আছড়ে পড়ে হাত ভাঙে। হাসপাতালে নেয়া হলেও খরচের কথা ভেবে বাড়ি ফেরে। অসচেতনতার অভাবেই মূলত কিশোরকে নেয়া হয় আনিচ কবিরাজের কাছে। তিনি গাছ বেটে বাঁশের কাঠি দিয়ে টুকরো কাপড় দিয়ে এমনভাবে বেঁধে দেন, যন্ত্রণা লাঘবের বদলে তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। একদিন পর পর কবিরাজের নিকট কিশোরকে নেয়া হয়। যন্ত্রণা যায়নি। ভাঙা হাড় জোড়া লাগা দুরস্ত হাতে ইনফেকশন হয়ে গেছে। অবস্থা যখন বেগতিক তখন কবিরাজ অপারগতা প্রকাশ করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেয়ার পরামর্শ দেন। এর আগে কবিরাজ কয়েক দফায় হাতিয়ে নেন প্রায় ৩ হাজার টাকা। অবশেষে কিশোরকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। কিশোরের সুস্থতা নিয়ে চিকিৎসকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়লেও অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। হাসপাতালেও যে সব সময় সুচিকিৎসার শতভাগ নিশ্চিত হচ্ছে তাও নয়। অনেক সময় অদক্ষ ব্রাদারকে দিয়ে শক্ত বাঁধনের কারণে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এরও উদাহরণ আছে। সে কারণে চিকিৎসকদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ অপ্রাসঙ্গিক নয়।

 

অবশ্যই সমাজে সচেতনতার আলো ছড়াচ্ছে। তবে যে গতিতে যতোটা আলো ছড়ানো দরকার অতেটা ছড়াচ্ছে না। সমাজের সচেতন মানুষগুলোই সচেতনতার আলো ছড়ায়। শিক্ষা অবশ্যই সচেতন করার সোপান। কিন্তু সেই শিক্ষা পেতে হবে। দিতে হবে। শিক্ষাদাতাই যদি কুসংস্কারাচ্ছন্ন থাকেন, নিজেই যদি প্রতারণার দোকান খুলে বসেন, তা হলে সেই দশাগ্রস্ত সমাজের দশা দেখে হতাশ তো হতেই হয়। সমাজের তারাই অপচিকিৎসার শিকার হয়, যারা দরিদ্র এবং অসচেতন। দারিদ্র্য দূর করতে নানামুখি উদ্যোগ প্রয়োজন। সমাজের সকলকে সচেতন করতে হলে সচেতনসমাজকে সমাজের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হতে হবে। প্রশাসনকেও হতে হবে সোচ্চার।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *