মানুষ আছি কি-না নতুন করে ভাবতে ইচ্ছে করে

 

জাল সনদে প্রতারক শিক্ষকতা করছেন, মালি সেজে বসেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক সেজে নেশাখোরদের মাঝে নেশার জন্য বিক্রি করছেন রেক্টিফাইড স্পিরিট, মারা যাচ্ছে মাতাল। এই যখন সমাজের হালচিত্র, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন- বিধি-বিধান, নিয়মকানুন তদারক কর্তা সবই কি উবে গেলো? তা না হলে সমাজে এতো অনিয়ম বাসা বাধে কীভাবে?

শিক্ষক নিয়োগে পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়েছে। তা না হলে জাল সনদে একজন প্রতারক শিক্ষকতার মতো চাকরি পেলেন কীভাবে? বেতনই বা তার হচ্ছে কি করে? এতেই স্পষ্ট আপাদ-মস্তক কতোটা দুর্নীতিগ্রস্ত। মাঝে কিছুদিন রেয়াজ হয়ে দাঁড়ালো, শিক্ষকতা পদে চাকরি পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অনুদান দিতে হবে। উন্নয়নের স্বার্থে অনুদান এক হাতে, সভাপতি অন্য হাতে। আর শিক্ষক নিয়োগ কমিটির শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ধারিত হারে উৎকোচ অনিবার্য হয়ে উঠলো। যোগ্য ও প্রকৃত মেধাবীরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই শিক্ষক হতে চান। যখন ডোনেশন আর উৎকোচের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন মুখ থুবড়ে পড়ে মেধা। যোগ্যতার মাপকাঠিতে যোগ্যদের ঠাঁই মেলে না। যার খেসারত জাতিকেই দিতে হয়, দিতে হচ্ছেও। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে প্রশাসনের তেমন হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। সেই সুযোগ সৃষ্টির জন্য নাকি সত্যিই প্রকৃত মেধাবী যোগ্যদের শিক্ষক পদে নিয়োগ নিশ্চিত করতে পদ্ধতি পরিবর্তনের তাগিদ উত্থাপন? সর্বশেষ জেলা প্রশাসক সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের তরফে বলা হয়েছে, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম দুর্নীতি রোধে কেন্দ্রীয় নিয়োগ বোর্ড থাকা দরকার, দরকার তত্ত্বাবধান। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখুক। দেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য প্রতারক জাল সনদ দিয়ে শিক্ষকতা করছেন। এদের মধ্যে দেড় শতাধিক ইতোমধ্যেই শনাক্ত হয়েছে। বাকিরাও ধরা পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রত্যাশা। শিক্ষা বিভাগের অনিয়ম দুর্নীতি দূর হোক। প্রকৃত যোগ্যরাই শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় আসুক, সুযোগ পাক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

স্বাস্থ্য বিভাগ? রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাদের কুম্ভঘুমের কারণে অনিয়মের মাত্রা যে দিন দিন বেড়েই চলেছে তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। ফার্মেসি থেকে দেদারছে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ওষুধ বিক্রি হয়, মুদি দোকানেও এন্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। ক্লিনিকগুলোর অধিকাংশেই অনিয়ম। কোনো কোনোটিতে তো চিকিৎসার নামে হত্যাকাণ্ডও ঘটানো হচ্ছে। তা হলে মালি কেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেজে অস্ত্রোপচার করবে না? সরকারি হাসপাতালের ঝাড়ুদারকেও সেবিকার মতো কাজ করতে দেখা যায়। কিছু ক্লিনিক আছে যাদের ডাক্তার বলতেই ওই আয়া বা পরিচ্ছন্নকর্মী। কিছুদিন আগেও তো চুয়াডাঙ্গার ভালাইপুর মোড়ের একটি ক্লিনিকে ফুটফুটে শিশু কন্যাকে মেরে ফেলা হলো? দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? হয়নি, হয় না। উপরন্তু তাদের রক্ষার জন্য যা যা করার তার সবই করা হয়। কেন? বেসরকারি স্বাস্থ্যদান কেন্দ্রে ও ডায়াগনস্টিকগুলোর কোনটি কীভাবে চলছে তা অবশ্যই স্বাস্থ্য প্রশাসনের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ কর্তার অজানা নয়। অভিযোগ আছে বিশেষ তদবির আর মাসে মাসে খুশি করার রেয়াজ। এসব দাওয়ায় আর জবাবদিহিতা না থাকায় জেলা পর্যায়ের বিভাগীয় কর্তার কুম্ভঘুম আরো গভীর হয়। পত্রপত্রিকার চিৎকারেও কর্তার ঘুম ভাঙে না। সমাজে ছড়ায় চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা। হোমিওপ্যাথি? ডিসপেনসারিই যদি পরিচয় হয় তা হলে তার সুযোগ তো সে নেবেই। নিচ্ছেও। অবাক হলেও সত্য যে, এখনও বংশ পরম্পরায় অনেকে উপাধি পায় ডাক্তার।

সমাজ সুন্দরের পথে নিতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন শিক্ষা বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করা। শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। গভার্নিং বডির সভাপতি হয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের বদলে পছন্দের নিয়োগ প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার পাঁয়তারাই যখন মূখ্য হয়ে দাঁড়ায় তখন বিবেক গুমরে কাঁদে। স্বাস্থ্য প্রশাসনের জেলা কর্তা হয়েও যখন সরকারি চোরাই ওষুধসহ ধরা পড়েন, তখন মানুষ আছি কি-না নতুন করে ভাবতে ইচ্ছে করে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *