বিবেকের টানেই পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যপরায়ণতা কাম্য

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য কি? শুধু পারিবারিক, সামাজিকই নয়, সকল ধর্মেই বোধ করি পিতা-মাতার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সবার ওপর। তারপরও বহু সন্তানই রয়েছেন যারা পিতা-মাতার প্রতি ন্যূনতম যতœবান হওয়া তো দূরের কথা, বৃদ্ধা-বৃদ্ধকে বাড়ির উচ্ছিষ্টের মতোই দেখতে শুরু করে। সুযোগ পেলে দূরের রাস্তায় ফেলে আসার মতোও ঘটনা ঘটছে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার মতো নির্মমতার উদাহরণ প্রতিদিনই বাড়ছে। জমিজমা নিয়ে পিতা-মাতাকে কোণঠাসা করে মানসিক কষ্টের মধ্যে ফেলে রাখার উদাহরণও ভুরিভুরি। তবে কি মানুষ দিনদিন বিবেকহীন হয়ে পড়ছে? নাকি যান্ত্রিক যুগে যন্ত্রদানবের মতো মানুষরূপী অমানুষ হয়ে পড়ছি? তা না হলে একজন সন্তান কি করে তার পিতাকে ফেলে আসতে পারে রাস্তায়?
‘তিন ছেলের দু ছেলে চিকিৎসক। অপর ছেলেও অর্থশালী। অথচ পিতা পড়ে ছিলো মজসিদের সামনে। ভিক্ষুক ভেবে অনেকে দু দশ টাকাও দিয়েছে। মসজিদের ইমাম কয়েকদিন খাবারও খাইয়েছেন। অসুস্থ হলে একপর্যায়ে উদ্ধার করে তাকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি যে পরিচয় দেন তা চমকে ওঠার মতোই। অথচ রাস্তায় পড়ে ছিলেন কেন? জবাবের বদলে কেবলই ঝরিয়েছেন অশ্রু। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে মারা গেলে খবর দেয়া হয় চিকিৎসক ছেলের কাছে। ছেলে তখন মিটিঙে ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে বলেন, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম কমিটির হাতে তুলে দেন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের জন্য। ওরাই কাফন-দাফন করে দেবে।’ ঘটনাটি অতি সম্প্রতি ঘটেছে ঢাকায়। এ চিত্র না হয় উচ্চবিত্ত পরিবারের, চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদার ডুগডুগি বাজারপাড়ার বৃদ্ধ আব্দুল আজিজ? তিনি অতোটা উচ্চবিত্তের বাবা না হলেও যে ছেলের পিতা, সেই ছেলে হাসপাতালে পিতার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে যখন ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, ‘ওরকম বাবার মরাই ভালো। অতো করে বললাম, জমি-জমাগুলো সব ভাগ করে দাও। দিলো না। বিষ খেয়ে এখন হাসপাতালে।’ এ উক্তি আওড়ানো ছেলের ওপর অবশ্য উপস্থিত অনেকেই মারমুখি হয়ে ওঠেন। তখন মাথা নিচু করে দাঁড়ালেও পিতার প্রতি কর্তব্য পালনের ন্যূনতম বিবেক জেগেছে কি-না কে জানে? যার পিতা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে মায়াবি জগত ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বিষপান করেছেন, তার সামান্যে কি আক্কেল ওঠে?
সকলকেই মরতে হয়। স্বাভাবিক মৃত্যুকামীদের বয়স বাড়ে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হয়। সে হিসেবে সকলকেই একদিন পিতা-মাতার আসনে আসীন হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ আমরা অনেকেই ভুলে যাই, পিতা-মাতার প্রতি আমাদের কতোটা আন্তরিক, কতোটা দরদী হওয়া উচিত। একজন পিতা তিনি নিজে নিজের সন্তানের প্রতি নিজের ভালোবাসার বিষয়টি একটু উপলব্ধি করলেই তো নিজের পিতা-মাতা তার ওপর কতোটা দরদী ছিলেন তা বুঝতে বাকি থাকে না। অথচ অনেকেই নিজের সন্তান, সংসার নিয়ে এতোটাই মেতে ওঠেন যে, পিতা-মাতার খোঁজ রাখার সময়ই পান না। যারা পিতা-মাতাকে উচ্ছিষ্ট ভাবেন, দূরে ফেলে আসেন, কিংবা কষ্টে রাখেন তারা কুলাঙ্গার। ওদের বিবেক জাগাতে আইন প্রণেতাদেরও জাগতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.