বিপন্ন-বিপর্যস্তদের পাশে দাঁড়াতে হবে

 

রাঙ্গামাটি এবং পার্বত্যাঞ্চলসহ চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের ঘটনায় যে মর্মন্তুদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা এক কথায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। বিশেষ করে রাঙ্গামাটির অবস্থা সব দিক থেকেই খুব নাজুক। পাহাড় যেন এখন মৃত্যু উপত্যকা বৈ আর কিছু নয়। বৈচিত্র্যময় পাহাড়ের চারদিকে শোকের ভারী বাতাস, কান্নার রোল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার দীর্ঘ ছায়া। স্বজনহারাদের আর্তনাদে কতোটা ভারী হয়ে রয়েছে পরিবেশ-পরিস্থিতি এরই চিত্র ফের ফুটে উঠেছে ১৬ জুন ২০১৭ তারিখে কয়েকটি দৈনিকের সচিত্র প্রতিবেদনে। বিগত কয়েকদিন ধরে সেনা ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ অন্যদের উদ্ধার তৎপরতা চলছে রাঙ্গামাটিতে। সবচেয়ে ভুতুড়ে পরিস্থিতি রাঙ্গামাটির। ওই মর্মন্তুদ ঘটনার পর বলা ভালো, যে ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়েছে পাহাড় ধস ও ঢলে তাতে দিন যতোই গড়াচ্ছে ততোই ভয়াবহ রূপ বেরিয়ে আসছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৫৭ জনে উন্নীত হয়েছে এবং এ সংখ্যাচিত্র আরো স্ফীত হতে পারে।

রাঙ্গামাটি একটি বিধ্বস্ত জনপদ। সেখানে বিদ্যুত, পানিসহ অনেক কিছুই নেই। সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। কবে নাগাদ এসব জরুরি কার্যক্রম চালু করা যাবে তা সঠিকভাবে বলতে পারছে না প্রশাসন। এছাড়া বৃহস্পতিবার নতুন করে থেমে থেমে হালকা বৃষ্টি হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা বিঘ্নিত হচ্ছে। গত মঙ্গলবার পাহাড়জুড়ে ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলের আঘাতে যে প্রলয়ঙ্করী ঘটনা ঘটে গেছে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোটা রাঙ্গামাটি শহর এলাকা। সাথে রয়েছে এর আওতাধীন দশটি উপজেলা। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি জনপদে বিরাজ করছে আতঙ্ক। ঝুঁকিতে বসবাস করছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। বিগত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে এই ধ্বংসযজ্ঞের পশ্চাৎ কারণ ও প্রতিকারের নানাদিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ইত্যাদি বহু কিছু হচ্ছে। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়, দেয়াল ও ভূমিধসে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো এরপর প্রশাসনের তরফে এর জন্য ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণ করে অনেক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও এর সিংহভাগই আজও বাস্তবায়িত হয়নি। যদি হতো তাহলে আজ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র এতো পুষ্ট রূপ লাভ করতো না।

এই গুরুতর মানবিক বিপর্যয়ে সবাইকে বিপন্ন-বিপর্যস্তদের পাশে দাঁড়াতে হবে কালক্ষেপণ না করে। সরকার ও প্রশাসনের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসহ সমাজের বিত্তবানদের আশু এগিয়ে আসার আমরা আহ্বান জানাই। এমন বিপর্যয় যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে এর জন্য সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় সব রকম পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক অনতিবিলম্বে। মনে রাখা দরকার, যে প্রতিবেশ সঙ্কট দেখা দিয়েছে তা না থামালে পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল থামবে না। পাহাড় ধসের মতো মর্মন্তুদ ঘটনা রোধে সমন্বিত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে এবং পার্বত্যবান্ধব উপায়ে বসতি স্থাপন ও চাষাবাদের কলাকৌশল পাহাড়বাসীকে শেখাতে হবে। এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক শৃঙ্খলার পুনরুজ্জীবন যে অতি জরুরি তা যেন আমরা ভুলে না যাই। তবে সর্বাগ্রে দুর্গতদের পাশে থেকে তাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করাতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.