বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সাইবার অপরাধ কমাতে সাহায্য করবে

 

দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দক্ষতার মান গর্ব করার মতো তো নয়ই, বরং হতাশাই দস্তুর। প্রায় শতভাগ প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়ার মধ্যে তা প্রতিফলিত। দ্রুত নগরায়ন হতে থাকলেও এখন পর্যন্ত গ্রামবহুল আমাদের সমাজে জীবনযাপনের ধারায় ঢিলেঢালা ভাব শুধু নয়, গ্রাম্যতার চিহ্নও এখানে-সেখানে। তবে আনন্দের বিষয়, পরিবর্তনের ছাপ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির ধারায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার জনজীবনে বাড়তে থাকায় অনেকটা ম্যাজিক ফলাফল কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রায় ১১ কোটি মোবাইলফোন সিম আঙুলের ছাপ দিয়ে (বায়োমেট্রিক) পুনর্নিবন্ধন করতে পারা এ রকমই এক বিরাট সাফল্য। গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহারকে জীবনের অঙ্গ করে তোলায় জনগণই এ সাফল্যের অন্যতম রূপকার। আমরা মোবাইলফোন ব্যবহারকারী আমজনসাধারণকে ধন্যবাদ জানাই। পুনর্নিবন্ধনের সাফল্যের জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও সকল মোবাইল অপারেটর কোম্পানির। আরও যা উল্লেখ না করলেই নয় তা হচ্ছে, এ কৃতিত্বের অনেকটা অংশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের। তিনি কতক মহলের সমালোচনা, বিরোধিতা ও অপতৎপরতা মোকাবেলা করে তার সিদ্ধান্তে ঋজু থেকেছেন এবং বাস্তবোচিতভাবে ধৈর্যশীল প্রচার, সময় বৃদ্ধি প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সুযোগ দিয়েছেন। এতে ভালো ফল পাওয়া গেছে। এ প্রতিমন্ত্রী শপথ গ্রহণের পরই যখন পুষ্পমাল্য নিয়ে তাকে অভিনন্দিত করা থেকে সকলকে বিরত থাকতে বলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিলো তিনি ভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে এসেছেন এবং কাজের পরিবেশ তৈরি করবেন। আশাকরি, তিনি এ ধারা অব্যাহত রাখবেন। মোবাইল ফোন ব্যবহারে বাংলাদেশ অগ্রণী দেশ।

ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে আমাদের অবস্থান বিশ্বে নবম। প্রায় ১৬ কোটি লোকের দেশে মোবাইল সিম (সাবস্ক্রাইবার আইডেনটিটি মডিউল) ব্যবহৃত হচ্ছে ১৩ কোটি ১৯ লাখের কিছু বেশি। ৩১ মে শেষ দিন পর্যন্ত পুনর্নিবন্ধিত হয়েছে ১০ কোটি ৮০ লাখ সিম। সাফল্য ৮২ শতাংশ। প্রায় আড়াই কোটি সিম নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেল। এগুলোর জন্যও দেড় বছর পর্যন্ত সুযোগ থাকছে পুনরায় মূল্য ও কর পরিশোধ করে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করিয়ে নেয়ার। তবে সংবাদপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সক্রিয় সিমগুলোর ৯৫ ভাগই পুনর্নিবন্ধিত হয়েছে; অর্থাৎ যে সিমগুলো প্রতিনিয়ত হাতে হাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সক্রিয় সিমের বাইরে রয়েছে আন্তর্জাতিক কল টারমিনেশনে যুক্ত ও অনিয়মিত ব্যবহারের কিছু সিম। যে পুনর্নিবন্ধন সম্পন্ন হলো তা আমাদের জাতির এক নবলব্ধ শক্তির পরিচয়। প্রত্যেককে নিজের ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিতে হয়েছে এবং সেবা প্রদানকারীর কাছে হাজির হয়ে আঙুলের ছাপ দিতে হয়েছে। পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় উপাত্তভাণ্ডার থেকে সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার একটা মেলবন্ধন ঘটেছে। মোবাইল অপারেটররা পুনর্নিবন্ধনের জন্য শেষদিকে গ্রাহকদের উপহারসহ প্রণোদনা দিয়ে, বিভিন্ন অফিসে ও জনস্থানে, এমনকি ফুটপাতে সেবা পৌঁছে দিয়ে অভিনবত্ব ও সেবাধর্মিতার পরিচয় দিয়েছে। এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অন্যান্য সেবায় কাজে লাগবে।

নিবন্ধন ছাড়া সিম, ভুয়া নিবন্ধন ইত্যাদির সুযোগ অপরাধীরা গ্রহণ করে আসছে। সন্ত্রাসী জঙ্গিরা সাইবার যোগাযোগ ব্যবহার করছে। সিমের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সাইবার অপরাধ কমাতে সাহায্য করবে। তবে এর দ্বারাই সাইবার অপরাধ ও জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ হবে এমন আশা নেই। পশ্চিমা উন্নত দেশে প্রতিটি মানুষের নাম-পরিচয় জন্মের মুহূর্ত থেকে পরবর্তী পর্যায়ে একাধিক কর্মসূত্রে ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এলেও অপরাধ বন্ধ হয়নি। আমাদের এ নতুন শক্তি ও দক্ষতা শতভাগ জন্ম নিবন্ধন অর্জনসহ একটি সুসংগঠিত সমাজ নির্মাণের সম্ভাবনার ইঙ্গিত।

 

 

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *