প্রসঙ্গ: ফসলহানি ও সালিসের নামে নির্মম নির্যাতন

 

সালিসের নামে কাউকে ডেকে নিয়ে বা ধরে এনে নির্যাতনের এখতিয়ার কারো নেই। এরপরও অনেকেই অমানাবিক নির্যাতন করে আইন নিজের হাতে তুলে নেন। কেউ কেউ ক্ষমতাসীনদলের দাপটে পারও পেয়ে যান। ফলে এ ধরনের নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। গতপরশু চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদার বিষ্ণুপুরে এক ব্যক্তিকে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। অভিযোগ, তিনি গ্রামেরই এক ব্যক্তির বেগুন-ঝালের ক্ষেত কেটেছেন।

অভিযোগের ভিত্তিতেই নয়, হাতেনাতে প্রমাণের পরও আইন কি কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের অধিকার দিয়েছে? না। অপরাধীর বিচারের জন্য আইন আদালত রয়েছে। সে পথে না হেঁটে নিজেরাই সামাজিক বিচারের নামে কাউকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করলে তা আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। বিষ্ণুপুরে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তাদের আদৌ দৃষ্টিগোচর হবে কি-না কে জানে। আইন অবশ্য সকলের ক্ষেত্রেই সমান। কিন্তু সমাজের বাস্তবতায় এ উক্তি যে কেবল কাগজে কলমেই তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশকর্তা পাওয়া দুষ্কর। অভিযোগ, হয় আর্থিক প্রভাব, না হয় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবেই প্রভাবিত হওয়ার কারণে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বহুলাংশেই হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে সামাজিক বিচারের নামে প্রহসন বন্ধের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই বলে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দায়িত্বশীলদের উদাসীন হলে তো চলবে না। সমাজকে সুন্দরের পথে নিতে হবে। পুলিশে লোকবল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এভাবে আর কতোদিন? পরিস্থিতি বেসামাল হওয়ার আগেই সামলানোটাই কি দুরদর্শিতার পরিচয় নয়?

মানুষ কখন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়? নানামুখি জবাব আছে। পুলিশে নালিশ করেও প্রতিকার না পেলে সে পথে হাঁটার বদলে সালিসে উদ্বুদ্ধ হয় মানুষ। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আবাদ করতে হয়। ফলন যখন ঘরে তুলবে তখন যদি কেউ শত্রুতামূলক ফসল কেটে দেয় তখন হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়ারই কথা। এরপরও কি কাউকে সন্দেহের বশে বা প্রমাণ পাওয়ার প্রেক্ষিতে মারপিট করা যায়? সমাজের ক’জনই বা জানেন এটা? জানানোর জন্য দরকার আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ। ক্ষেত বিনষ্টের পরও যেমন দুষ্কৃতী শনাক্ত করতে পারছে না পুলিশ, তেমনই অন্যায়ভাবে কাউকে ধরে বা ডেকে নিয়ে নির্যাতন করলেও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের নজির মিলছে না। এভাবে চলতে থাকলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা যে বাড়বে তা নতুন করে বলাই বাহুল্য। প্রতিকার প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। একই সাথে সামাজিক দায়িত্বশীলদেরও সমাজে সচেতনতার আলো ছড়াতে হবে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে হবে। অবশ্য শুধু সচেতনতা সৃষ্টির মধ্যদিয়েই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করা যায় না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হয়।

জমির আবাদ বিনষ্টকারীদের শনাক্ত করে প্রকৃত দোষী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সালিসের নামে একজনকে নির্মমভাবে নির্যাতনেরও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া দরকার। ফসল শুধু ক্ষেতমালিকেরই নয়, পরোক্ষভাবে দেশের সম্পদ। ফসলহানি রুখতে হবে। থামাতে হবে নির্যাতন। সমাজে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহে অতো লোকবল থেকে লাভ কি?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *