প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা ও বাস্তবতা

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সোমবার প্রশাসনের সচিবদের সাথে অনুষ্ঠিত এক সভায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ উদ্দেশে ২৫ অক্টোবরের পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন আর বসবে না। এ সময় মন্ত্রিসভায় নীতিনির্ধারণী কোনো বিষয়ে আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচন হবে ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেভাবে গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচন হয়, এখানেও সেভাবে সংবিধান মেনে নির্বাচন হবে। কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি যাতে আর জোর করে ক্ষমতা দখল করতে না পারে, সে পথ রুদ্ধ করতেই হবে। ভবিষ্যতে কেউ বা কোনো গোষ্ঠী অবৈধভাবে যাতে ক্ষমতা দখল করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সজাগ ও সচেতন থাকারও আহ্বান জানান তিনি।

 

প্রধানমন্ত্রীর সোমবারের বক্তব্যের পর এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, সরকার সত্যি সত্যি দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। এতোদিন একটা ক্ষীণ আশা ছিলো, হয়তো শেষ মুহূর্তে সরকার বিরোধীদলের সাথে সংলাপের মধ্যদিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে একটা গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা মেনে নেবে। সে আশায় এখন গুড়েবালি। আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের পর দেশের রাজনীতির চালচিত্রটি কেমন হবে? বিরোধীদল বারবারই বলে আসছে, তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। তারা ইতোমধ্যে বড় ধরনের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে। বিএনপি যদি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যায়, তাহলে সেই নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্যতা পাবে? এককথায় বলে দেয়া যায়- না। শুধু দেশে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও দাতা সংস্থাগুলোও একতরফা নির্বাচনে গঠিত সরকারের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে না। আসলে আমরা সবাই চাই সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। অথচ এ বিষয়টিতে সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

 

প্রধানমন্ত্রী দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তা মেনে নেয়া কঠিন। বলেছেন, কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি যাতে জোর করে ক্ষমতা দখল করতে না পারে, সেই পথ রুদ্ধ করতেই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে হবে। তিনি নিশ্চয়ই এক-এগারোর সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, এক-এগারোর সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দোষে আসেনি; সেটা এসেছিলো দু বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে। এবারও যদি বিরোধীদলের আন্দোলনের বিপরীতে সরকার রিঅ্যাক্ট করে এবং বড় ধরনের সংঘাত-সহিংসতা দেখা দেয়, তাহলে তৃতীয় কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে পারে বৈকি। সে ক্ষেত্রে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কোনো প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা হবে না। অগণতান্ত্রিক শক্তিকে রাজনীতির বাইরে রাখার একটাই উপায় আছে এবং তা হলো- সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। প্রধানমন্ত্রী যে এই সাধারণ কথাটি বোঝেন না, তা নয়। কিন্তু তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে আসছেন। বিরোধীদলের দাবির প্রতি সরকারের অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কোনো অর্থ খুঁজে পাই না আমরা।

 

সরকারি দলের নেতারা আজ যে ভাষায় কথা বলছেন, অতীতে বিএনপি নেতারাও সেই ভাষায়ই কথা বলেছিলেন। তাতে কোনো লাভ হয়নি তাদের। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে বাধ্য হয়েছিলো। বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিলো, সে ব্যাপারে বিএনপির অনমনীয়তার খেসারত দিতে হয়েছিলো দলটিকে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অনমনীয়তা কোনো সুফল বয়ে আনে না। রাজনীতিক সম্প্রদায়, বিশেষত দু বড় দলের নেতৃত্বকে বহুল পরীক্ষিত অনমনীয়তার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সমঝোতার রাজনীতি এখনও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি এদেশে। একবার এ ধরনের রাজনীতি পরীক্ষা করে দেখাই যাক না, তা কতোটা ফলপ্রস্যু। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চিন্তাকাঠামোয় পরিবর্তন আসবে। তারা নতুন উপলব্ধিতে সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বিরোধীদলের সাথে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন- এটাই প্রত্যাশা।