নির্বাচনী রোডম্যাপ : স্থাপিত হোক সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত

 

নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ আমাদের দেশে বহু পুরনো। সুষ্ঠু ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে ইসির কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়- সে বিষয়টিও নানাভাবে আলোচিত। অন্যদিকে নির্বাচনকালীন প্রেক্ষাপটে যে ক্ষমতা রয়েছে ইসির, তা যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে ইসি- এমন কথাও বিশ্লেষকরা বহুবার বলেছেন। বাস্তবতা হলো, নানা সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসিকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেলেও শেষপর্যন্ত নিজেদের সমালোচনার বাইরে রাখতে কিংবা অভিযোগ’মুক্ত করতে সমর্থ হয়নি ইসি।

আইনি কাঠামোগুলো পর্যালোচনা ও সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করতে পরামর্শ গ্রহণ, সংসদীয় এলাকার নির্বাচনী সীমানা পুনর্ননির্ধারণ, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সরবরাহ, বিধি অনুসারে ভোটকেন্দ্র স্থাপন, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা ও সুষ্ঠু নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ- এই সাতটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়ে ঘোষিত হলো রোডম্যাপ। বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে পরিকল্পনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের বিষয়টি অস্বীকারের সুযোগ নেই। এছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় কীভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব- সে বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ফলে এসব বিষয়ও ইসি বিবেচনায় নিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণাকালে উল্লেখ করেছেন, এই দলিলই সর্বশেষ নয়। সময় ও বাস্তবতার নিরিখে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন কর্মকর্তারা আরও বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সময়ের প্রয়োজনে ঘোষিত রোডম্যাপে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের আয়োজনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ আস্থাশীল। নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে বিদ্যমান আইনই যথেষ্ট বলেও তিনি দাবি করেন।

বলাই বাহুল্য, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হয়েছে দাবি করলেও বিএনপি এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনও করেছে। এ নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির মতো উদ্বেগ ও আতঙ্কের ঘটনাও ঘটেছে ইতঃপূর্বে। সঙ্গত কারণেই নির্বাচন প্রশ্নে দেশের মানুষের মনে এক ধরনের ভীতি ও উদ্বেগ জন্মানো অমূলক নয়। সঙ্গত কারণে, ইসির কর্তব্য হওয়া দরকার নির্বাচন বিষয়ে এমন পদক্ষেপ নিশ্চিত করা যাতে গণমানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় এবং জাতি একটি সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার পেতে পারে। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিলো ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। সে ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সঠিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে, সংবিধান অনুযায়ী ইসি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করবে বলেই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।

নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাসহ জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ইসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নজির রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন-বিধি প্রয়োগ করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা গেলেও পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এগুলো আরও যুগোপযোগী করা জরুরি কি-না তাও খতিয়ে দেখতে হবে। ভোট প্রক্রিয়া আরও সহজতর করার পাশাপাশি ইসির কর্মকাণ্ড এমন হোক যাতে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও ইসিকে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে নির্বাচনকে অর্থবহ করে তুলতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *