দেশ কি অতোটা-ই রসাতলে গেছে?

 

একদিনের চঞ্চলা এখন বৃদ্ধা। বয়সের ভারে কাবু। সারা শরীরে ব্যথা, মাংসপেশি পিশে মারে। অনিদ্রা। ছেলে-মেয়েরা যে যার মতো। স্বামী মারা গেছেন বেশকিছুদিন হলো। অসুস্থতার বিষয়ে তেমন কেউ খোঁজই রাখে না। কতোদিনই আর ওভাবে থাকা যায়? হাতে টাকাও নেই। একটা বাগ দেয়া মোরগ সোয়া দুশো টাকায় বিক্রি করলেন। ঘরে ২৫ টাকা রেখে বাকিটা নিয়ে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে রওনা হলেন। সদর আধুনিক হাসপাতালের টিকেট কিনলেন। একটি কক্ষে চিকিৎসকের কাছে বসে শরীরের সব সমস্যার কথাই খুলে বললেন। চিকিৎসক কয়েকটি পরীক্ষার কথা জানালেন। পাশেই ছিলো এক যুবক। তিনি বৃদ্ধাকে সাথে করে নিয়ে গেলেন হাসপাতালের সামনেরই একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। বেশ কয়েকটি ডায়াগনসিস করে দাবি করলেন ১৪শ টাকা। বৃদ্ধার চোখ চড়কগাছ। তিনি বললেন- আমি মুরগি বেচে টাকা এনেছি দুশো। গাড়ি ভাড়া দিয়েছি, হাসপাতালের টিকেট কেটেছি। কাছে আছে দেড়শো। ওষুধ কিনবো, বাড়ি ফিরবো। সরকারি হাসপাতালে টিকেট কাটার পর অতো টাকা লাগবে কেন? এটা হাসপাতাল নয়, টাকা দিতেই হবে? এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত তার নিকটজনদের খবর দিয়ে ৯৫০ টাকা নিয়েই বৃদ্ধাকে ছাড়া হয়েছিলো। ঘটনাটি বেশ কিছুদিন আগের হলেও প্রায় একই রকমের ঘটনা যে ঘটেই চলেছে তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য চুয়াডাঙ্গায় এসে দরিদ্র এক পিতার বিড়ম্বনা ও মেয়ের মৃত্যু সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি এর চাক্ষুস প্রমাণ। এখন প্রশ্ন- এসবের কি প্রতিকার নেই?

মুরগি বেচে চিকিৎসা নিতে এসে বৃদ্ধা পড়েছিলেন বেকায়দায়। তাকে হয়রানির মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিলো হাসপাতালে ঘুরঘুর করা দালালের কারণে। হাসপাতাল এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিকে ও ক্লিনিক নার্সিং হোমে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার জন্যই দালালরা ঘুর ঘুর করে। কিছু চিকিৎসক আছে তারা বাড়তি আয়ের লোভে অপ্রয়োজনেও ডায়াগনস্টিতে পাঠান। ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার জন্যই কৌশলে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। যারা এগুলো করেন তাদের মধ্যে মানবিক দায়িত্ববোধের চেয়ে বাণিজ্যিক গুরুত্বই যে অধিক পেয়ে বসেছে তা বলাই বাহুল্য। গ্রাম থেকে প্রতিদিনই সরল সোজা মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরমুখি হচ্ছে। অবাক হলেও সত্য যে, বাস থেকে নেমেই কোনো কোনো রোগী রিকশাচালকের মাধ্যমে প্রতারিত হয়। কিছু রিকশাচালক আছেন যাদেরকে কিছু অসাধু চিকিৎসক বিশেষ কমিশনের বিনিময়ে রোগী ভাগিয়ে আনতে প্রলুব্ধ করেন। এরকম অভিযোগ তো মাঝে মাঝেই উত্থাপিত হয়। শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগের অধিকাংশেরই অপমৃত্যু ঘটে। হাসপাতালে দালাল চক্রের উৎপাত রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। মাঝে ছাত্রসমাজের ব্যানারে কিছু যুবক হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার ঘোষণা দেয়। মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করে। কর্মসূচি পালনের আগেই হাসপাতাল দালালমুক্ত হয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অবশ্য সে পরিবেশ খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নিজস্ব প্রশাসনিক তৎপরতা না থাকলে বাইরের চাবুকের কার্যকারিতা আর কতোদিনই বা থাকে? তৎকালীন সিভিল সার্জন তখন অনেকটা দায়সারাগোছের কথা বলেন। অবশ্য তিনি শেষ পর্যন্ত খুলনায় সরকারি ওষুধসহ নারীর ঘরে ধরা পড়ে চিকিৎসকদের মুখে কালি মাখিয়েছেন। মামলা হয়েছে। চাকরি গেছে। এরপরও কি ওষুধ চুরি বন্ধ হয়েছে? হলফ করে কি বলা যায়- হ্যা! সরকারি ওষুধ সরবরাহ আছে। হাসপাতালেই অধিকাংশ শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। হয় বিকল, তা না হয় অন্য কিছু। আড়ালে বাড়তি আয়। তা না হলে মুরগি বিক্রি করে চিকিৎসা নিতে আসা বৃদ্ধাকে হয়রানি হতে হলো! কাঁদতে হলো! শুধু কি তাই? হাসপাতালে রোগী ভর্তির পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে তলব করে দেখানোর তেমন তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ব্যতিক্রম, দরিদ্র রোগীকে ভিজিট আওয়ারের বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অলিক ভাবনা বটে। না হলে দরিদ্র আবু হোসেনকে কেন হাসপাতালে অসুস্থ মেয়েকে ভর্তি করিয়েও বাইরের চেম্বারে গিয়ে ওষুধ লেখাতে হলো? সেই ওষুধ কিনতে গিয়ে কেনই বা প্রতারিত হতে হলো? ৮ টাকার ইনজেকশন কিনতে হয়েছে ৪০ টাকায়। সেই ইনজেকশন যখন পুশ করা হলো, তখনও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ন্যাক্কারজনক উদাহরণ সৃষ্টি হলো। মারা গেলো রোগী। এ দায় কার? ইনজেকশনের দাম বেশি নেয়া হলো কেন? রোগীর শরীরে ইনজেকশন পুশ করার সময় সিনিয়র স্টাফ নার্স চিকিৎসকের পরামর্শ লক্ষ্য করলেন না কেন? শিক্ষানবিশ কার কথা মতো ইনজেকশন দিতে গেলেন? ওষুধের দাম বেশি দেয়ার দায় কেউ ক্রেতাকে দিতেই পারেন। ক্রেতার দোষ তিনি কেন যাচাই করলেন না? আমাদের দেশে এখনও ওষুধের দোকানগুলোতে ক্রেতারা দামাদামি করেন না। যাচাই করার চিন্তা মাথায় নেন না। এভাবে যদি প্রতারিত হওয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে তা হলে আস্থাহীনতার কারণে যাচাই করা ছাড়া গত্যান্তর কী? তাই বলে ১৬ টাকার ইনজেকশনের দাম ৮০ টাকা নিয়ে বিক্রেতা পার পেয়ে যাবে? দেশ কি অতোটা রসাতলে গেছে- যতোটা রসাতলে গেলে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য থাকে না?

কোনো অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপনের পর তা যথাযথ গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া হলে অনিয়মের মাত্রা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ে। শুধু চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ও হাসপাতাল এলাকার কিছু ডায়াগনস্টিক, ক্লিনিক, নার্সিং হোম ও কিছু ফার্মেসির ক্ষেত্রেই অনিয়ম নয়, দেশের অধিকাংশ এলাকায় চিকিৎসার নামে যাচ্ছেতাই শুরু হয়েছে। সেবার কথা বলে বাণিজ্যের রমরমা পথে বসাচ্ছে অসংখ্য সরলসোজা পরিবারকে। অবাক হলেও সত্য যে, সকল শিক্ষার্থী চিকিৎসক হতে পারেন না, আগ্রহীদের মেধাবী হতে হয়। আগ্রহী মেধাবীরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সেবার ব্রত নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ নেন। একজন শিক্ষার্থীকে চিকিৎসক করতে হলে সরকারের তথা দেশবাসীর অনেক টাকা খরচা করতে হয়। খরচের উদ্দেশ্য হলো- দেশবাসী সেবা পাবে। সেই সেবার মহান দায়িত্বে এসে কেউ কেউ যখন সামান্য অর্থের জন্য দরিদ্র রোগীকেও পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান, তখন বিবেক গুমরে কাঁদে। অর্থশালী হওয়ার অঘোষিত প্রতিযোগিতা বিবেকবোধকে ভোতা করে দেয়, দিচ্ছে। তা না হলে ১৬ টাকার দু অ্যাম্পুল ইনজেকশনের দাম ফার্মেসি থেকে ৮০ টাকা নেয়া হয় কীভাবে? কোন সাহসে? উত্থাপিত অভিযোগসমূহের সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জরুরি।

পুনশ্চ: স্বাস্থ্য বিভাগের অতো অসুস্থতার জন্য পদস্থ কর্তাদের কুম্ভঘুম কতোটুকু দায়ী?একটু ভেবে দেখবেন ধর্মাবতা।

Leave a comment

Your email address will not be published.