দেশে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্যই রাজনৈতিক

 

দেশবাসীকে ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে রেখে ক্ষমতার মসনদে বসে জেদ বজায় রাখার যুক্তি যেমন অসহনীয় হয়ে উঠেছে, তেমনই লাগাতার আন্দোলনের বোঝা আমজনতার কাছে বহন অযোগ্য হয়ে পড়ায় বাড়ছে ক্ষোভ। এ আবার কোন আন্দোলন, কোন সভ্যতা? দু পক্ষের একপক্ষের ক্ষমতায় থাকা আর অপর পক্ষের ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে আমজনতার প্রাণ উষ্ঠগত। পরিত্রাণের প্রত্যাশায় দেশবাসী খাবিখেলেও দু পক্ষই অটল। অবস্থা দৃষ্টে বলতেই হয়, হায়রে রাজনীতি! হায়রে নেতৃত্ব। কে বাঁচাবে? এসো আমাদের রক্ষা করো। শোনা যাচ্ছে তিনি প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন।

 

‌দেশজুড়ে আমজনতার দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে। বাড়ছে দুর্ভোগ। হরতাল অবরোধ ছাড়া আর কোনো কর্মসূচি নেই? যারা আন্দোলনের নামে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করছেন তারা দেশের খেটেখাওয়া মানুষগুলোর কথা কি ভাবছেন? মাঠভরা ফুলকফি মাঠেই ফুঁটে ঝরে পড়ছে। বাধাকপিরও অভিন্ন দশা। যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাচ্ছেন তাদের দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে এ আবার কোন দাবি আদায়? বিরোধীদলকে বলতে না দেয়া, নির্বাচনে সমান সুযোগ সৃষ্টি না করাই বা কোন ধরনের গণতন্ত্র? জনসাধারণের দুর্ভোগের সূচক কোথায় পৌঁছুলে বিরোধীদল বিকল্প কর্মসূচির কথা ভাববেন? মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলাটাই কি তীব্র আন্দোলন? এছাড়া কি-ই বা করার আছে? পাল্টা এ প্রশ্নও যুক্তির বাইরে নয়। সরকার যা খুশি তাই একতরফাভাবে করে যাচ্ছে, বিরোধীদলকে পাত্তাই দিচ্ছে না। প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন। যুক্তি পাল্টা যুক্তি। এসবের মধ্যেই সমাধান চেয়েছিলো দেশবাসী। হিংসা, সহিংসতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজেদের মধ্যে বসে সমাধানের বুদ্ধিটুকুও হারিয়েছে। এখন জাতিসংঘের প্রতিনিধির দিকে তাকিয়ে। নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরা করতে না পারার ব্যর্থতা অবশ্যই নিজেদের। এটা বোঝার কি আমরা জ্ঞানও হারিয়েছি?

 

৭২ ঘণ্টার অবরোধ চলছিলো। শেষ হতে না হতে অজ্ঞাত স্থানে বসে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হলো, অবরোধ বাড়ানো হয়েছে। আরো ৭২ ঘণ্টার অবরোধ চলবে। হায়রে কর্মসূচি। এ কর্মসূচির কারণে দেশের সাধারণ মানুষের কী অবস্থা, দুর্ভোগের মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা নূন্যতম অনুভব করলে এরকম কর্মসূচির অন্তত কিছুটা বিচ্ছেদ-বিরাম দেয়া হতো। যারা ক্ষমতায় রয়েছে তারাও আমজনতাকে স্বস্তি দিতে পারছে না, পারছে না রক্ষা করতে। নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। সরকার কি পারছে? না পারার ব্যর্থতা স্বীকার করার মতো বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই অমূলক নয়। দেশের মানুষ স্বস্তি চায়। আমজনতার কান্না কীভাবে দু পক্ষের শীর্ষ নেতাদের কানে পৌঁছুবে? জনগণের ভোট পাওয়ার মতো কাজ করলে কেন ভোট দেবে না। নির্বাচনে উভয়পক্ষের সমান সুযোগ সৃষ্টি করলে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা কেন? কেনই বা বিরোধীদল আমনজতার কথা ভেবে জনদুর্ভোগের বিকল্প কর্মসূচির পথে হাঁটছে না? এতে কি তাদের সমর্থন বাড়ছে না কি রাজনীতিকে চরম আস্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেয়ার জন্যই জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দেয়া হচ্ছে? ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা। দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক। রাস্তায় বের হলে মরতে হচ্ছে গুলিতে, না হয় পুড়ে। ট্রেন? ভাবলেই আতঙ্কে শরীর অসাড় হয়ে পড়ছে। নাশকতা। দেশজুড়ে অভিন্ন চিত্র। এরপরও রাজনৈতিক নেতা-নেতৃরাই ভরসা।

 

দেশবাসীর স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নেতা-নেত্রীদের দয়া নয়। অধিকার। এ অধিকার অবশ্যই সংবিধান নিশ্চিত করে। অবশ্যই দেশের জন্য সংবিধান। সংবিধানের জন্য দেশ নয়। বিরোধীদের নির্যাতন করে নির্মূল করা যায় না, যায়নি। বরঞ্চ নির্যাতনে সংগঠিত হওয়ারই উদাহরণ রয়েছে। গণতন্ত্র জনগণের আস্তা অর্জনেরই তাগিদ দেয়। জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে যেমন আস্তা অর্জন করা যায় না, তেমনই স্বেচ্ছাচারিতও জনগণকে বিমুখ করে। দেশে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্যই রাজনৈতিক। এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই কাম্য।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *