দূর হোক পেশিশক্তি প্রয়োগের হীন মানসিকতা

চুরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়লেও শারীরিকভাবে নির্যাতনের সুযোগ নেই, তাকে আইনে সোপর্দ করার বিধান রয়েছে। অথচ সন্দেহের বশে একজনকে ধরে চোর অপবাদে মারধর করা হচ্ছে। দরিদ্র পিতা-মাতা ছেলেকে ঠেকাতে গেলে তাদেরকেও মারধর করে আহত করার ঘটনা ঘটছে। যে সমাজে এ রকম ঘটনা ঘটে সেই সমাজকে আর যাই হোক পরিপূর্ণ সভ্য বলা যায় না, সমাজের পুলিশকেও দায়িত্বশীল বলে স্বীকৃতি দেয়া উচিত হবে না।

চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গার নাগদাহ উত্তরপাড়ায় সালিসসভার লোকজন একজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের মোমিনপুরে সালিসের নামে এক যুবককে ধরে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তুলে নির্যাতন করা হয়। ছেলেকে নির্যাতন করা হচ্ছে দেখে দরিদ্র পিতা-মাতা ঠেকাতে গেলে তাদেরকেও মারধর করা হয়। কতোটা বিবেকহীন না হলে এটা সম্ভব?  বিবেকবানদের বিবেক কি জাগ্রত নাকি ঘুমিয়ে? আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের সদস্যরাই বা কী করছেন? সালিসের নামে একজনকে ডেকে নিয়ে সন্দেহের বশে মারপিট আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব অবশ্যই পুলিশের। পুলিশ উদাসীন হলে, অর্থাৎ অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করলে সমাজে অমানবিক ঘটনা বাড়বে। অমনাবিকতার শিকার হয়ে কেউ বিপথগামী হলে তার খেসারত সমাজকেই দিতে হয়। ফলে সমাজ শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর করতে হলে সমাজের সচেতন মানুষগুলোকে দায়িত্বশীল হয়ে সকলের বিবেক জাগিয়ে তোলা তথা সচেতনতার আলো ছড়িয়ে পেশিশক্তি পরিহারে উদ্বুব্ধ করা প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, বদলে যাওয়া সময়ে কে কার জন্য ভাবে?

মানুষ যতোই যান্ত্রিক হয়ে উঠুক, যতোই ব্যস্ত হোক। সমাজকে তো অস্বীকার করা যায় না। আইনকানুনই বলুন, আর পুলিশ আদালতই বলুন, সমাজের স্বার্থেই সমাজের মানুষই এসব প্রচলনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কোনটি ক্ষতি, কোনটি সমাজের জন্য কল্যাণকর তা ভেবেই আইনপ্রণয়ন করা হয়। সমাজে এক সময় সালিসের মাতবরদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার প্রচলন ছিলো। স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত আর পেশিশক্তি প্রয়োগের নগ্নতার কারণেই সমাজে সালিস আর স্বীকৃত নয়। ইউনিয়ন পরিষদে সালিস বিচারের বৈধতা রয়েছে। সার্বিক ব্যবস্থা ও ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে জনপ্রতিনিধিদের। স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশনাও স্পষ্ট। এরপরও সমাজের কেউ কেউ সালিসের আয়োজন করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাপিয়ে দেয়া হয় মনগড়া ফতুয়া। পেশিশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে কর্তৃত্ব ফলানোরও চেষ্টা করেন মতলববাজ কথিত মাতবর। এদেরই কেউ কেউ অমানবিক আচরণ করেন। হামলায় উসকে দেন। সন্দেহের বশে মারধর করেই ক্ষান্ত হন, মারার পর আবার পুলিশেও দেয়া হয়। এসব ঘটনাপ্রবাহ আইনের যথাযথ প্রয়োগে ঘাটতির কারণেই প্রবাহমান। আইন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকলে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া তথা আইনভঙ্গের প্রবণতা হ্রাস পায়।

চুয়াডাঙ্গা মোমিনপুরের যুবককে চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে ও তার পিতা-মাতাকে মারধর করা গুরুতর অন্যায় বললেও ভুল হবে, দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধীদের দণ্ড নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের দায়িত্বশীলদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একইভাবে সমাজের সচেতন মানুষগুলোকে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে আলোকিত সমাজ গড়তে হবে। আলোকিত সমাজে কুসংস্কার, অন্যায়, অবিচার থাকে না। প্রতিষ্ঠা পায় ন্যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *