দায় এড়ানোর অজুহাতে বিবেকের দংশন ঠেকানো যায় না

চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের ফুলবাড়ি গ্রামের স্কুলছাত্রী অন্তরা মারা গেলো কেন? সাপে কাটলেই কি অনিবার্য মৃত্যু? অবশ্যই না। স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বহু আগেই নিশ্চিত করেছে বিষধর সাপে দংশন করে বিষ প্রয়োগ করলেও যথাসময়ে সাপের বিষনিষ্ক্রীয় ওষুধ উপযুক্ত পন্থায় প্রয়োগ করলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠেবে। যার উদাহারণ ভুরি ভুরি। তাহলে অন্তরাকে মরতে হলে কেন? কেনই বা খালি হলো তার মায়ের বুক। সন্তানের লাশই বা বহন করতে হলে কেন তার বাবাকে? না, অন্তরার অভিভাবকদের অসচেতন বলা যাবে না, সন্ধ্যায় সর্প দংশনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে যথাসম্ভব দ্রুততর সময়েই চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো তাকে। হাসপাতালে অ্যান্টিস্নেভেনম বা সাপের বিষনিষ্ক্রীয় ভ্যাকসিন ছিলো না। বাইরে থেকে তা কিনতে হয়েছে। ওই ওষুধ শরীরে দেয়ার পর অন্তরা মারা যায়। ওকে না বাঁচাতে পারার দায় এড়ানোর অজুহাত হয়তো দায়িত্বশীলদের ঠোঁটস্থ, তাতে বিবেকের দংশন কি থেমে থাকে? যদিও জাগ্রত বিবেকই টের পায় দংশনের কষ্ট। ওই কষ্ট কার কতোটুকু ছুঁয়েছে কে জানে!

বাইরে থেকে কেনা অ্যান্টিস্নেভেনম কার্যক্ষমতা নিয়ে যতোটা না প্রশ্ন তার চেয় অধিকতর ক্ষোভমাখা প্রশ্ন- চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে অ্যানটিস্নেকভেনম থাকলো না কেন? দীর্ঘদিন ধরেই বৈরী আবহাওয়ার জনপদ চুয়াডাঙ্গাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় সাপের উপদ্রব পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। শীতে উপদ্রব না থাকলেও গরম ও বর্ষায় বহু মানুষ সর্প দংশনের শিকার হয়। আগে কথিত কবিরাজদের সোনাতন পদ্ধতিতে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার হিড়িক ছিলো। সাপে কাটা রোগী মানেই ওই ওঝাদের কাছে নিয়ে প্রতারিত হতে হতো। অবাক হলেও সত্য যে, অর্ধযুগ আগেও সাপে কাটা রোগী চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেয়া হতো। ওই সময় একজন চিকিৎসক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে হাসপাতালের ওষুধ রক্ষণাগার থেকে বের করে আনেন অ্যানটিস্নেকভেনম। এরপর সাপে কাটা বহু রোগীর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। অবাক হলেও সত্য যে, যে ওঝা কবিরাজ সাপুড়ে সাপের বিষঝাড়ার নাটক করে সাপ ধরে, সাপের খেলা দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়- সেই ওঝা কবিরাজ সাপুড়েদেরও অনেকে বিষধর সর্প দংশনের শিকার হলে হাসপাতালের অ্যান্টিস্নেভেনমে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সুচিকিৎসার প্রতিবেদনে এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরও ওঝা-কবিরাজের নিকট নিয়ে বিষঝাড়ার নাটক হচ্ছে না তা নয়। হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুচিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে রোগী। এরপর যদি জেলা সদরের সরকারি আধুনিক হাসপাতালে ওষুধ না থাকার কারণে বা অবহেলায় সুচিকিৎসা বঞ্চিত হয়ে রোগীর মৃত্যু হয়, তাহলে চিকিৎসা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারটা থাকলো কোথায়?

দুর্ভাগ্য আমাদের, দুর্ভাগ্য এলাকাবাসীর- তা না হলে কি জেলার সদর আধুনিক হাসপাতালে অ্যানটিস্নেকভেনম থাকে না? বরাদ্দ পাওয়া যায়, আবার কখন কেমন করে না জানি ফুরিয়েও যায়। ফুরিয়ে যাওয়ার আগে কেন তা বরাদ্দ নেয়া হয়নি? অবশ্যই আগাম বরাদ্দ চাওয়া-পাওয়ায় দায়িত্বীশলের দূরদর্শিতা প্রয়োজন। সেই দূরদর্শিতায় ঘাটতিই কি পিতা-মাতার চোখের সামনে কেড়ে নিচ্ছে না, তরতাজা সন্তানের প্রাণ? সন্ধ্যায় ঝড় উঠলো। রান্নাঘরের জ্বালানি কাঠ তুলতে নান্দার পাশের বস্তা নিতেই সর্প দংশনের শিকার হলো। তাকে মোটরবাইকযোগে দ্রুত নেয়া হলো হাসপাতালে। চিকিৎসক বললেন, অ্যানটিস্নেকভেনম নেই। বাইরে থেকে কিনে তা রোগীর শরীরে দিতে না দিতে মৃত্যু হলো। এ মৃত্যুর দায় কি চুয়াডাঙ্গা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এড়াতে পারে? কোনো অজুহাত নয়, পর্যাপ্ত অ্যানটিস্নেকভেনম মজুদ রাখতে হবে। রুখতে হবে চুরি। গ্রামবাংলায় সচেতনতার আলো ছড়াতে হবে। তার আগে নিশ্চিত করতে হবে সরকারি হাসপাতালে মানসম্পন্ন সুচিকিৎসাসহ এ ধরনের মৃত্যুর জবাবদিহিতা।

পুনশ্চ: ক্ষমা করো অন্তরা। তোমার তোমাদের বাঁচাতে না পারার কষ্ট আমাদের তাড়া করছে আর কতোকাল?

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *