জিন ভর করা রোজিনার বটিকা এবং আমাদের সমাজ

 

চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদার রোজিনার পেতে বসা প্রতারণার আস্তানাটি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে জিন ভর করার গল্পের ফাঁদে ফেলে এলাকার অসংখ্য সরলসোজা মানুষকে ঠকিয়েছেন। বটিকা দিয়ে একজনকে হত্যা করার অভিযোগে অবশেষে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

৫শ ১ টাকা নজরানা নিয়ে এক প্রভাবশালীর ষড়যন্ত্রে দরিদ্র দিনমজুরকে বটিকা দেন তিনি। রোজিনার তৈরি করা বটিকা সেবনের তিনদিনের মাথায় দিনমজুর আনছার আলী মারা গেছেন। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর সামনে রোজিনা অন্যের ষড়যন্ত্রে বটিকা দেয়ার কথা স্বীকারও করেছেন। যে রোজিনা জিনের কথা বলে সরলসোজা মানুষ ঠকিয়েছেন, সেই জিন তার গ্রেফতার ঠেকাতে পারা তো দূরের কথা, গর্ভের সন্তানের খবরও দিতে পারেনি। পারে না। অথচ সেই জিনের নাম ভাঙিয়ে দিব্যি অন্যের চিকিৎসা দিয়েছেন। হাতিয়ে নিয়েছেন টাকা। আর সমাজ? দীর্ঘদিন ধরে রোজিনার ভণ্ডামি বুঝে না বুঝে নীরবেই সহ্য করেছে। যখন মানুষ মেরেছে তখন কি আর আমজনতা নীরব থাকে? থাকেনি। আটক করে পুলিশে দিয়েছে। বিলম্বে হলেও সমাজ জিনের ভয়ে বসে না থেকে যে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে তা প্রশংসার দাবি রাখে বৈকি। কারণ এটাও সচেতনতারই বহির্প্রকাশ। অবশ্যই সমাজে সচেতনতার আলো ছড়াচ্ছে। তবে যতোটা বেগে অন্ধকার দূর করা সম্ভব হলে রোজিনার মতো কেউ লোক ঠকানো আস্তানা গড়তে পারে না, ততোটা গতি বোধ করি সচেতনতার আলোতে নেই। সমাজ সুন্দর করতে হলে, সমাজ থেকে প্রতারক বিতাড়িত করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে হয় না, নিজেদেরও আইন প্রয়োগে নিয়োজিতদের তাগিদ দিতে হয়। রোজিনার অপচিকিৎসার বিষয়ে প্রশাসনকে আগেই জানানো হলে দিনমজুর আনছার আলীকে নিশ্চয় বটিকার শিকার হতে হতো না। রোজিনা ও তার সহযোগিতার দৃষ্টান্তমূলক বিচার কাম্য।

রোজিনাকে দিয়ে গাছড়ার বটিকা সেবন করিয়ে দিনমজুরকে অসুস্থ করতে চেয়েছিলো গ্রামেরই প্রবাস ফেরত এক ব্যক্তি। রোজিনা এটাও আমজনতার সামনে স্বীকার করেছেন। ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য, ওই দিনমজুরের ভিটে প্রতিবেশী প্রবাস ফেরত প্রভাবশালী কিনতে চেয়েছিলেন। দিনমজুর অসুস্থ হবেন, চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে। প্রতিবেশীর নিকট থেকে ধার-কর্য করবেন। ঋণের বোঝা বেড়ে গেলে ভিটেটুকু বিক্রি করবেন। হায়রে জমির লোভ! কতোটা হীনমানসিকতার মানুষ না হলে এরকম ষড়যন্ত্র করতে পারে? ষড়যন্ত্রকারী প্রতিবেশী মুকুলের বিরুদ্ধেও থানায় মামলা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, রোজিনার ওপর ভর করা কুয়েতি জিন কিছু করতে না পারলে দিনমজুর আনছার মরলো কেন? দিনমজুরকে তাবিজ কবজ, মন্ত্রতন্ত্রে মারা হয়নি। তাকে মারা হয়েছে বটিকা দিয়ে। গাছের মার দুনিয়ার বার। জগতে এমন কিছু গাছ রয়েছে যা শুধু বিষাক্তই নয়, প্রাণী ধরেও খায়। গাছড়ার ওষুধকে বিজ্ঞান তো অস্বীকার করে না। ইউনানি হেকিমি চিকিৎসা স্বীকৃত হলেও নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসার অনুমোদন দেয় সরকার। যদিও সেই সুযোগে অনেকেই প্রতারণার ফাঁদ পেতে সরলসোজা মানুষদের ঠকায়। রোজিনা কীভাবে পেলো মানুষ মারা বটিকা তৈরির ফর্মুলা? এটাও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। যে সমাজের অলিতে গলিতে মাঠে ঘাটে রাস্তার ধারে ধুতরোর মতো গাছ থাকে তার দোষ-গুণের কথা রোজিনাদের জানা কি খুব অসম্ভব? ওটা জানতে তার জিন লাগেনি। যে সমাজের মানুষকে রোজিনা জিনের কথা বলে বোকা বানিয়েছেন, সেই রোজিনা কিছু গাছড়ার খোঁজ রাখেন না তা আবার হয় নাকি?তাছাড়া ওটা গাছড়ারই বটিকা নাকি কেমিকেল? তাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

প্রতারণা রোধে সর্বপ্রথম প্রয়োজন সচেতনতা। যে সমাজের মানুষ যতো সচেতন সেই সমাজে রোজিনার মতো ভণ্ড ওঝার সংখ্যা ততোই কম। সমাজের প্রকৃত সচেতন মানুষগুলোকেই অধিক দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। আইন প্রয়োগেও প্রয়োজন আন্তরিকতা।

Leave a comment

Your email address will not be published.