কৃষি পণ্যের হারানো বাজার পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নিতে হবে

পৃথিবীর সব দেশে সাধারণভাবে এ রকম একটা প্রত্যাশা কাজ করে যে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যাবে, সম্ভাবনাময় খাতগুলো দিন দিন সম্প্রসারিত হবে। আমাদের কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় অন্যান্য দ্রব্যপণ্যের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানিও একটা সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ দেশ থেকে আলুসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এসব পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বাড়ার পরিবর্তে কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে কমে যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে সম্প্রতি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই উদ্বেগ যথার্থ এবং উদ্বেগ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের যে প্রতিবেদন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পেশ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির পরিমাণ ছিলো ১ লাখ ২ হাজার ৯৮৩ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমে যায় অর্ধেকের বেশি: সে বছর মাত্র ৪০ হাজার ২২৯ টন আলু রপ্তানি হয়। শাকসবজির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা: ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৮৭৮ টন শাকসবজি রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু পরের বছর তা কমে গিয়ে হয় ২৫ হাজার ৪৭০ টন। রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা বছর বছর বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
কিন্তু এর কারণ কী? কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনই বলছে, কৃষিপণ্য ও শাকসবজি রপ্তানির পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমে যাওয়ার কারণ এসব পণ্যের রপ্তানিকারকদের নন-কমপ্লায়েন্স, অর্থাৎ তারা তাদের পণ্যের গুণগত মান রক্ষাসহ আমদানিকারকদের বেধে দেয়া মানদ-গুলো অনুসরণ করছেন না। যেমন ২০১৪ সালে রাশিয়ায় রপ্তানি করা আলুতে ব্রাউন রুট ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়। তারপর রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অথচ আমাদের আলু রপ্তানির জন্য রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাজারসম্ভাবনা বিরাট।
কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানির ক্ষেত্রে নন-কমপ্লায়েন্সের অভিযোগ কিন্তু সাম্প্রতিক বিষয় নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত শাকসবজির ১১৫টি চালান বাতিল হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিবছরই চালান বাতিলের হিসাব ওই প্রতিবেদনে আছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাতিল করেছে শাকসবজির ৯০৮টি চালান।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদেশে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের হারানো বাজার পুরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা উচিত, এই যে বছরের পর বছর ধরে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত কৃষিপণ্যের চালান বাতিলের ঘটনা ঘটে আসছে, এর প্রতিকারের জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকেরা তাদের পণ্যের গুণগত মান তথা আমদানিকারক দেশগুলো নির্ধারিত কমপ্লায়েন্স শর্তগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, সেদিকে দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন কৃষিসঙ্গ নিরোধ বিভাগের। তাদের কি এদিকে কোনো দৃষ্টি আছে? এ বিষয়ে কারও কোনো দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বোধ আছে কি?
পণ্যের গুণগত মানসংক্রান্ত নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানির চালান বাতিল হওয়া শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, দেশের ভাবমূর্তিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সেই প্রভাব কাটানো কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং আমাদের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাজার সংকোচনের এই উদ্বেগজনক ধারা এখনই বন্ধ করার জোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। হারানো বাজার দ্রুত পুনরুদ্ধারের পর তা আরও সম্প্রসারণের পদক্ষেপও নিতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *