কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতক এবং অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ

 

কুড়িয়ে পাওয়া এক নবজাতককে নিঃসন্তান অধিকাংশ দম্পতিই যে চাইবে তা বলার অবকাশ রাখে না। নিঃসন্তান সকল দম্পতির কষ্টই প্রায় সমান। তাহলে কুড়িয়ে পাওয়া এক নবজাতককে কোন কোলে তুলে দেয়া উচিত হবে? সঙ্গত প্রশ্নের জবাব তথা সমাধান অবশ্যই আইনের দৃষ্টিতে আদালতের কাছে রয়েছে। তাহলে কাড়াকাড়ি কেন? কেনই বা কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতককে নিয়ে কখনো কর্তব্যে অবহেলা, কখনো অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ? তদন্ত দাবি অবশ্যই অমূলক নয়।

চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের এক নম্বর প্লাটফরমের ঊর্ধ্বমুখি তথা উত্তরপ্রান্তে ডাকঘরের সামনে থলের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো নবজাতক। গত রোববার দুপুরে তার কান্নায় কৌতূহলীদের ভিড় জমে। জিআরপি চুয়াডাঙ্গা স্টেশন ফাঁড়ির সদস্যরা উদ্ধার করেন। জিআরপিরই এক কনস্টেবলের স্ত্রীর নিকট রাখা হয়। ওই দম্পতির এক বছরের এক সন্তান থাকার সুবাদে কনস্টেবলের স্ত্রী পরম মমতায় আগলে রেখে নিজের বুকের দুধ পান করিয়ে কান্না থামিয়েছেন। সুস্থতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এরই মাঝে সমাজসেবা অধিদফতরের প্রবেশন অফিসার নবজাতককে নিজ হেফাজতে নিয়ে অসুস্থতার কারণে নাকি দামুড়হুদার এক নিঃসন্তান দম্পতির নিকট সাময়িক জিম্মায় রেখেছেন। পরে খুলনাস্থ বেবিহোমে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এসব কি প্রবেশন কর্মকর্তার দায়িত্বশীলতার পরিচয়? এখতিয়ার? আবেদক যখন একাধিক তখন পাওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ে কি তিনি একক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

স্টেশনের প্লাটফরমে নবজাতক রেখে গেছেন কে বা কারা তা জানা সম্ভব হয়নি। তা জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও মনে হয় না। যদিও সেটাই বিধেয়। প্রবেশন অফিসার ওই পুত্র নবজাতককে নিজ হেফাজতে নেয়ার আগে বহু উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত দম্পতি বা তাদের প্রতিনিধি জিআরপি পুলিশ ফাঁড়িতে উপস্থিত হয়ে নবজাতককে পাওয়ার উপায় জানতে চেয়েছেন। প্রবেশন কর্মকর্তা নিজ হেফাজতে নিয়ে প্রথমে যে কর্তব্যপরায়ণতার নজির রেখেছেন, সেই নজির তখনই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়েছে যখন নিজের মনগড়া ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটিয়ে এক নিঃসন্তান দম্পতির হাতে তুলে দিয়েছেন। যদিও তিনি সাময়িক জিম্মায় দেয়ার কথা বলেছেন। তবুও তার স্বেচ্ছাচারিতা আড়ালেরই চেষ্টা বলে অভিযোগ অনেকের। কেননা, নবজাতক উদ্ধারের পর যে দম্পতির নিকট ছিলো সেখানে আর যাই হোক একজন মায়ের বুকের দুধতো পাচ্ছিলো। তাহলে সেখান থেকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে কেন অন্যের জিম্মায়?

স্টেশনের প্লাটফরমে বাজার করা থলেয়ভরা নবজাতক কেন? কেনই বা জীবননগর উপজেলা শহরের পয়ঃনিষ্কাশন নালার মধ্যে নবজাতকের মরদহে পড়ে? এসব প্রশ্নের নানামুখি জবাব মেলে। প্রশ্ন ওঠে কোনো মা-ই কি তার গর্ভে ধারণ করা সন্তানকে স্বেচ্ছায় স্টেশনে না নরদমায় ফেলে দেন? সমস্যাটা শুধু সামাজিকই নয়, যথাসময়ে সতকর্তা অবলম্বন করতে না পারা এবং অসচেনতাও এ জন্য অনেকটা দায়ী। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও উঠতি বয়সীদের মধ্যে সহজাত প্রবৃত্তির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ অনাকাঙ্ক্ষিত নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংখ্যা হ্রাস করা সম্ভব। ধর্মীয় অনুশাসন সেক্ষেত্রে অবশ্যই সহায়ক। একদিকে যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত নবজাতকের আগমন রুখতে হবে, তেমনই কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতককে নিয়ে টাকা ছিটিয়ে কাড়াকাড়ির চেয়ে আইনগতভাবে তাকে গ্রহণের পথে হাঁটতে হবে।

কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতককে অবশ্যই সত্যিকারের নিঃসন্তান ও সন্তান হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই এমন শিক্ষিত স্বচ্ছল দম্পতির হাতেই তুলে দেয়া যেতে পারে। আদালতের মাধ্যমে অথবা বেবিহোম থেকে বেওয়ারিশ নবজাতককে দত্তক নেয়া দম্পতিকেও আনতে হবে জবাবদিহিতার আওতায়। খুঁজে বের করতে হবে নবজাতক হত্যা ও ফেলে দেয়া বা ফেলে দিতে বাধ্য হওয়া মাকে। তদন্ত করে দোষীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চয় প্রত্যাশিত সমাজ গঠনে সহায়ক হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *