এ অমানবিকতা কি কালের বিবর্তনে অনিবার্য?

অজ্ঞাত পরিচয়ের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। বারান্দায় পড়ে থাকলো। মারা যাওয়ার পর ফেলে রাখা হলো লাশ। এক পর্যায়ে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবেই দাফন। মাঝে মাঝেই পত্রিকায় এরকম খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তিকে কোথা থেকে আনা হলো, কে ভর্তি করালো এসব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাবও তেমন মিলছে না।

 

কিছুদিন আগে এক মহিলাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মাথায় ও চোখে মুখে পোকা গিজগিজ করতে দেখা যায়। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তির কয়েকদিনের মাথায় মারা গেলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। গতকালও দৈনিক মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় ঠাঁই পায় অজ্ঞাত পরিচয়ের এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারও পরিচয় মেলেনি। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবেই দাফনের প্রক্রিয়া করা হয়। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম কমিটির দায়িত্বশীলরা আন্তরিক হলে সুষ্ঠুভাবে দাফন হলো, না হলে পড়ে থাকলো। গতকাল অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ হাসপাতালেই রাখা ছিলো। আজ দাফন হতে পারে। এসব কি মানবতা বিপর্যয়ের চিত্র নয়? কেউ কেউ বলতেই পারেন, পথে-ঘাটে মরে পড়ে থাকছে না এটাই তো অনেক।

 

যেখানে সেখানে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকা, পরিচয় না মেলার কারণে চিকিৎসায় অবহেলা। অনেকটা বিনা চিকিৎসাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। এরকম মৃত্যু বৃদ্ধি এবং পরিচয় উন্মোচনসহ অসুস্থ হয়ে পথে-ঘাটে স্টেশন বাসস্ট্যান্ডে পড়ে থাকার কারণ অনুসন্ধানে তেমন তদন্তও হচ্ছে না। কে করবে? দায়িত্ব কার? তাও যেন অজানা। মস্তিষ্ক বিকৃত, প্রতিবন্ধী বা ভিক্ষুক-টিক্ষুক হবে, রোগাক্রান্ত বহিরাগত, ও নিয়ে অতো মাতামাতির কী দরকার? এরকম মন্তব্যযুক্ত প্রশ্ন তুলে দায় এড়ানো যায় যে সমাজে সে সমাজের বিবেক কতোটা মানবিক? সভ্য সমাজ ব্যবস্থা কিন্তু এরকম মৃত্যুকে সমর্থন করে না। প্রত্যেকেরই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান চিকিৎসা ও শিক্ষার অধিকার রয়েছে। এ অধিকারগুলো সাংবিধানিক। প্রত্যেকের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দেয়ার মতো পরিবেশ গড়তে না পারার অর্থ হলো ব্যর্থ সমাজ।

 

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে কিছুদিন পর পর অজ্ঞাত পরিচয়ের বেশ কয়েক নারী ও পুরুষকে ভর্তি করানো হয়। এদের সকলেরই শরীরে ছিলো অনাহারীর ছাপ। বয়স আর যাই হোক বার্ধক্যে পৌঁছায়নি। অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকার এক পর্যায়ে হাসপাতালে নেয়া হলেও তাদের পরিচয় উন্মোচনের বিশেষ উদ্যোগ যেমন নেয়া হয়নি, তেমনই হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগের তরফেও উল্লেখযোগ্য তৎপরতার নজির মেলেনি। স্বজনদেরও সন্ধান হয়নি। তারা খোঁজ করেনি বা সন্ধান পায়নি। যে মানুষটি বেওয়ারিশ লাশ হচ্ছে সে নিশ্চয় কারো না কারো সন্তান বা ভাই-বোন। রোগাক্রান্ত হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, এতে আপদ দূর হয়েছে বলে ধরে নিয়ে মুখ ঘুরিয়েছে? যদি তাই হয়, তা হলে বুঝতে হবে মানবতার মৃত্যু হয়েছে। মানবতা বিসর্জনের আড়ালে কি দারিদ্র্য? নাকি চক্রান্ত ষড়যন্ত্রসহ অন্য কিছু?

 

মানবিক মূল্যবোধ হারানো সমাজকে আর যাই হোক সভ্য সমাজ বলা যায় না। যেখানে সেখানে অসুস্থ হয়ে মানুষ পড়ে থাকবে, দায়সারা গোছের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার মধ্যে কেউ কেউ দায়িত্ব পালনের তৃপ্তি খুঁজবে আর চিকিৎসায় হবে অবহেলা, পুলিশ থাকবে নীরব। এ নিষ্ঠুরতা, দায়িত্বহীনতা, অমানবিকতা কি কালের বিবর্তনে অনিবার্য?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *