উপাসনালয়ে হিংসার দাবানল কেন?

কে বা কারা গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের একটি মসজিদে আগুন দিয়েছে। টেক্সাসের ছোট শহর ভিক্টোরিয়ার ওই মসজিদটি আগুনে পুড়ে গেছে পুরোটাই। ওই অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য একমাত্র প্রার্থনাস্থল ওই মসজিদটি। সাত বছর আগেও ওই উপাসনালয় একবার হামলার শিকার হয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের নব-অভিষিক্ত প্রেসিডেন্ট ৭টি মুসলমানপ্রধান দেশের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই ঘটনা ঘটলো। অন্যদিকে টেক্সাসের ঘটনার ক্ষত দগদগে থাকতেই জানা যায়, কানাডার কুইবেক সিটি মসজিদে গুলিবর্ষণের ন্যাক্কারজনক ঘটনার কথা। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী এই হামলায় নিহত হয়েছেন ছয় ব্যক্তি। আহত হয়েছেন আরও আটজন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই হামলায় দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন এটি একটি সন্ত্রাসী হামলা। উত্তর আমেরিকার ওই দুইটি দেশ ছাড়াও গত ডিসেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে মসজিদে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সেই হামলায়ও আহত হন অন্তত তিন মুসল্লি।

একটি মসজিদ বা মন্দির অথবা গির্জা কিংবা প্যাগোডা হলো সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার উপাসনালয়। এক পূতপবিত্র পরিবেশ রক্ষিত হয় যেকোনো উপাসনালয়ে। এই বিশ্ব এক, একটি মাত্র সূর্য, একটি মাত্র মনুষ্য বসবাস উপযোগী এই পৃথিবী, মানব জাতিও একটি। একেশ্বরবাদও বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মাবলম্বীদের সাধারণ বিশ্বাস। এই সকল একক বিষয়ের মধ্যেই রয়েছে একটি অসাধারণ ছন্দোবদ্ধ বৈচিত্র্য। জগতের বৈচিত্র্যই একটি বিশ্বকে নান্দনিক সৌন্দর্য দান করে। সেই বৈচিত্র্য যদি লঙ্ঘিত হয়, যদি মনে করা হয় আমার ভাবনাটাই একমাত্র মহান; আমার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিশ্বাসই একমাত্র অনুসরণীয় পথ; তা হলে যাদের ওপর এই মতবাদ বা ভাবনা চাপিয়ে দেয়া হবে, তাদের নিকট থেকে সাধ্যানুযায়ী তীব্র প্রতিক্রিয়া আসাটাও অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। বিশ্ব যে আজ অস্থির এবং অশান্তির শতসহস্র স্ফুলিঙ্গ যে ভয়াবহ দাবানল তৈরি করার নিমিত্ত ফুঁসছে নিরন্তর, তার নেপথ্যে রয়েছে পরমত অসহিষ্ণুতা এবং নিজের মত ও পথকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার উত্কট বাসনা। তাতে সৃষ্টি হয় হিংসার। আর হিংসা নামক ভাইরাস বংশবিস্তার করতে পারে রক্তবীজের ঝাড়ের মতো। তাই, হিংসার লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরতে না পারলে তা শতধারায় শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে বিশ্বব্যাপী হিংসা ও হিংসাসৃষ্ট সন্ত্রাস ছড়াতেই থাকবে। কে রক্ষা পাবে হিংসার সেই নিষ্ঠুর আগুন থেকে?

উত্তর আমেরিকায় মসজিদে হামলার নিন্দাজ্ঞাপন করার ভাষা আমাদের জানা নেই। আজ আমরা বিষণ্ণ। আজকের মতো যাদের হৃদয় তাদের নিজ নিজ উপাসনালয় ধ্বংস হওয়ার শব্দে বিদীর্ণ হয়েছে অতীতে, তাদের প্রতিও আমরা সমব্যথী। আমরা এক হয়েও বৈচিত্র্যময়, বৈচিত্র্যময় হয়েও প্রধানত আমরা এক জাতি। আমরা সকলেই আজ হিংসা নামক ভাইরাসে আক্রান্ত। এই বিশ্বকে মুক্ত করতেই হবে এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস থেকে।

Leave a comment

Your email address will not be published.