উচ্ছেদ হোক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানো সকল স্থাপনা

 

ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের বারোবাজার রেল লেবেল ক্রসিঙে ট্রেনের ধাক্কায় বরযাত্রীবাহী বাসের ১২ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত দল প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রতিবেদনে স্টেশনমাস্টার, গেটম্যান ও বাসচালককে দায়ী করে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রেলক্রসিঙের পাশে রেলওয়ে সম্পত্তির ওপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সুপারিশ। এ সুপারিশ কতোটা গুরুত্ব পাবে? অতীতের দস্তাবেজ যে সাক্ষ্য দেয় তা সুখকর নয়। ভবিষ্যতের জন্যই বর্তমানকে কাজে লাগানো দরকার।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্পদ-সম্পত্তি শুধু বেদখলই নয়, দীর্ঘদিন ধরেই যেন চলছে হরিলুট। অনিয়ম দুর্নীতি যে রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাও অস্বীকার করার জো নেই। তা না হলে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে গড়িমসি কেন? কেনই বা জনগুরুত্বকে থোড়ায় কেয়ার করে রেলগেটের কোল ঘেঁষে জমি লিজ দেয়া হয়? লিজ নিয়ে, না নিয়ে যেসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয় তার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। বারোবাজার রেলগেটে ট্রেনের সাথে যাত্রীভর্তি বাসের ধাক্কায় রক্তপাতের জন্য যেমন গেটম্যানের কর্তব্যে অবহেলা দায়ী, তেমনই দায়ী রেলগেটের আশেপাশে রেলের জমিতে গড়ে তোলা স্থাপনা। গেটম্যান না থাকার কারণে লেবেলক্রসিঙে গেটটি দেয়া হয়নি। গেটম্যান দায়িত্ব পালন করছেন কি-না সেদিকেও নজর রাখেননি স্থানীয় কর্তা। আর বাসচালক? তিনি রেলের আগমন দেখতে পাননি অবৈধ স্থাপনার কারণে। এরপরও বাসচালক দায় এড়াতে পারেন না। কারণ রেললেবেল ক্রসিং। সে কারণেই সম্ভবত তাকেও দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের তালিকায় রাখা হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী পরিবেশের দিকেও বিশেষ নজর দেয়া জরুরি। তদন্ত কমিটি সেটি যথাযথ গুরুত্ব সহকারেই দেখে স্থাপনা উচ্ছেদের সুপারিশ করেছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসা করা বা বাস করাদের পুনর্বাসনের সুপারিশ করা হয়েছে কি-না তা অবশ্য জানা যায়নি।

রেললাইনের পাশের জমিতে স্থাপনা তৈরির জন্য কি শুধুই দখলদার দায়ী? যখন স্থাপনা নির্মাণ করা হয় তখন দেখার কেউ থাকে না? তাদের অন্ধত্বের আড়ালে কি উৎকোচ নয়? লিজ? কোন জমি কী শর্তে লিজ দিলে রেললাইন ও রেল লেবেল ক্রসিং ঝুঁকিমুক্ত হবে তা না দেখে লিজ দেন কীভাবে? চুয়াডাঙ্গার বেশ কয়েকটি রেললেবেল ক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ। বিড়ম্বনারও। চুয়াডাঙ্গা স্টেশনের পূর্ববর্তী স্টেশন মোমিনপুরের কার্যক্রম স্থগিত করার কারণে তার পূর্ববর্তী স্টেশন থেকে ডাউন ট্রেনের খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা স্টেশন তার দায়িত্ব পালন করতে শুরু করে। নামানো হয় সিগন্যাল। এ সিগন্যালের সাথেই যুক্ত চুয়াডাঙ্গার প্রধান সড়ক শহীদ আবুল কাশেম সড়কের লেবেলক্রসিঙের গেট। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রেলগেট পড়ে থাকার কারণে বিড়ম্বনার যেন শেষ থাকে না। একইভাবে এ লেবেলক্রসিঙের পাশেও যেমন স্থাপনা রয়েছে তেমনই মুন্সিগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের নিকটস্থ লেবেলক্রসিঙের পাশেও স্থাপনা নির্মাণের কারণে বেড়েছে ঝুঁকি। চুয়াডাঙ্গা বেলগাছি লেবেলক্রসিঙে তো মাঝে মাঝেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা অল্পের জন্য রক্ষা পায়। গেটম্যান থাকে, থাকে না। অবৈধ স্থাপনাও রয়েছে সেখানে। ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের বারোবাজারের মতো দুর্ঘটনার পর কি দর্শনা হল্টস্টেশন সংলগ্ন লেবেলক্রসিংসহ অন্যান্য স্থানের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে? সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে দুর্নীতিমুক্ত হলে উন্নয়নের জোয়ার সত্যিই রেলযোগাযোগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হতো। হয়নি। হবে বলেও আশা করা কঠিন। অনিয়ম দুর্নীতি দূর করতে পারলে রেলওয়ের চিত্রটাই যে পাল্টে যাবে তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। কর্তব্যে অবহেলা দুর্নীতিরই অংশ। অবৈধ স্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দেয়া লিজ বাতিল করে তা উচ্ছেদের মধ্যদিয়ে রেললেবেল ক্রসিং মুক্ত করতে পারলে দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে। পুনর্বাসন? এটাও ভাবতে হবে। বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে। মোদ্দাকথা, দুর্ঘটনার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.