অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জেনেই হোক দাফন

 

যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত সবসময়ই বিড়ম্বনামুক্ত। যদিও কার্যক্ষেত্রে সকল সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। এরপরও আইন যখন, কখন কী করতে হবে তার সুস্পষ্ট দিক নিদের্শনা দেয়, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীলের ভুল করা কি মানায়? এ ধরনের ভুলের অপর নাম অবশ্যই অনিয়ম। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা হাড়োকান্দির স্কুলছাত্রী ভুন্দির লাশ পুকুর থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা না করা কি অনিয়ম নয়? একটি ভুল বা অন্যায় দ্রুত সুধরে নেয়ার বদলে তা আড়াল করতে গেলে অন্যায়ের মাত্রা বাড়ে বয় কমে না।

 

তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। নিখোঁজ হলো। পরদিন পুকুরে পাওয়া গেলো লাশ। পুকুরের পানিতে পড়ে ডুবে মৃত্যু হলে যেমনটি হওয়ার কথা তেমনটির বদলে হত্যারই আলামত মৃতদেহে পরিলক্ষিত হলে জিনে মেরেছে বলে বানোয়াট প্রচারণা চালানো হলো। অপরদিকে গ্রামজুড়ে গুঞ্জন ওঠলো, শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেয়া হয়েছে। গুঞ্জনকে গুজব বলে ধরে নিলেও জিনে হত্যা করে পানিতে ফেলেছে বলে দাবি কি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায়? তাহলে যে পুলিশ অফিসার সরেজমিন তদন্তে গেলেন তিনি লাশ উদ্ধার না করে ফিরলেন কেন? দায়িত্ব পালনে ভুল নাকি জেনেশুনে বুঝে অনিয়মের সাথে আপস? সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন। রহস্যজনক মৃত্যুর রহস্য জানার উপায় যখন মায়নাতদন্ত, তখন ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অর্থ হলো, ঘটনা আড়াল করারই অপচেষ্টা।

 

ভুন্দির মৃত্যু রহস্যজনক। রহস্যজনক মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনেই শুধু নয়, যেকোনো অপমৃত্যুরই পুলিশি তদন্ত অপিরহার্য। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণই বিধেয়। ভুন্দির লাশ উদ্ধার এবং উদ্ধার পরবর্তী পরিস্থিতিই দৈনিক মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় প্রকাশের পূর্বেই যখন গ্রামজুড়ে হত্যার গুঞ্জন এবং স্কুলছাত্রী ভুন্দির প্রকৃত মৃত্যুরহস্য উন্মোচনের দাবিতে স্বোচ্চার গ্রামের একাংশ, তখন কেন আলমডাঙ্গা থানার কর্তাকে মাথাভাঙ্গার সাংবাদিকের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ? মামলা হয়েছে, লাশ তুলতে হয়েছে বলে? দাফনের ১০ দিন পর লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করানো আইনেরই অংশ। সংবাদও। কারণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ গণমাধ্যমে প্রকাশ সাধারণ মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

 

অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অপমৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের মৃত্যু নিকটজনদের শুধু শোকের সাগরেই ভাসায় না, লাশ ময়নাতদন্তেও তাদের বাড়তি ব্যথিত করে। কারণ, মানসিকতা। সমাজ এখনও অতোটা সচেতন হয়নি, যতোটা সচেতন হলে ময়নাতদন্তে ব্যথিতের বদলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতেই অধিক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে। সে কারণে ময়নাতদন্তের দরকার নেই, যা হওয়ার হয়ে গেছে। যে চলে গেছে তাকে আর ফিরিয়ে পাবো না। মামলা করে কী হবে? এরকম খোড়া প্রশ্ন তুলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের জন্য অনেকেই উঠে পড়ে লাগেন। এতে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অপরাধী পার পেলে তার কুপ্রভাব পড়ে গোটা সমাজে। আর অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ? অপরাধ প্রবণতা রোধে সহায়ক।

 

মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চায়। তা নিশ্চত করতেই বিধি-বিধান। অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আইনের অংশ। অপমৃত্যুর মৃতদেহ শাদা চোখে দেখে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা যায় না বলেই ময়নাতদন্ত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাই স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি জানেন। প্রযুক্তিও এখন বলে দিচ্ছে অনেক কিছু। অপরাধ প্রবণতারোধে মৃত্যুরহস্য ধামাচাপা দেয়া নয়, প্রকৃত কারণ জেনে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণই সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সকল কর্তারই এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *