অজুহাত নয় : দূষণমুক্ত হাসপাতাল চাই

 

আমরাই আমাদের পরিবেশ দুষিত করি। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার জন্য সকলে একটু সচেতন হলেই ঘরে বাইরে রাস্তা-ঘাট বাসস্ট্যান্ড রেলস্টেশন এমনকি হাসপাতালের চিত্রটাও পাল্টে যায়। যেহেতু সকলেই অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর হীনমানসিকতায় ভুগি সেহেতু হাসপাতালের পরিবেশ দূষণের দায় আমরা কেউই নিতে রাজি নই। অবশ্য রাজি হবোই বা কেন? নিয়মশৃঙ্খলা না থাকলে কেই বা তা মেনে বোকা সাজতে চায়? সে কারণে আমজনতার চেয়ে কিছুটা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তাদের দায় বেশিই বলতে হয়।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের পরিবেশ দূষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গতকাল দৈনিক মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, তা সত্যিই দুঃখজনক। হাসপাতালে কার যে কখন কী অবস্থায় যেতে হয় তা কেউই হলফ করে বলতে পারবে না। জেলা সদরের হাসপাতালটির নাম আধুনিক হলেও আধুনিকতার ছোঁয়ার যে বড্ড অভাব তা বলাই বাহুল্য। অনিয়মের অন্ত নেই। হাসপাতাল থেকে সরলসোজা রোগী ভাগিয়ে নেয়ার জন্য বিভিন্ন ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল গিজ গিজ করে। প্রয়োজন না হলেও কোনো কোনো চিকিৎসক বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এসবের আড়ালে অর্থলিপ্সতা। থাক সে কথা। হাসপাতালের পরিবেশ অতো ভয়াবহ কেন? এরও যুক্তির অভাব নেই। আবাসিক মেডিকেল অফিসার বলেছেন, প্রয়োজনের তুলনায় লোকবলের অভাব। নির্মাণ কাজের জন্য পয়ঃনিষ্কাশনের নালাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সিভিল সার্জন বলেছেন, নতুন এসেছি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিতদের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি বলেছেন, কী করবো! ওরা কথা শোনে না। কে কখন আসে কখন যায় বোঝার ক্ষমতা আমার নেই।

অপরদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগী বলেছেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিতদের কেউ কেউ সেবিকা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে। কারণ রোগীর অতিরিক্ত চাপ। স্থানীয়দের অনেকেই বলেছেন, হাসপাতাল যেভাবে যতোবার পরিষ্কার করার কথা, সেভাবে পরিষ্কার করা হয় না। এ কারণে রোগী ও রোগী দর্শনার্থীরাও হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে ন্যূনতম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন না। যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলে পরিবেশ এতোটাই ঘিনঘিনে করে তোলা হয়েছে যে, হাসপাতালে নাকে কাপড় বা রোমাল দিয়ে ছাড়া প্রবেশ করা দায়। বিকট দুর্গন্ধে গা রি রি করে ওঠে। হাসপাতালের পরিবেশ দেখে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা বেশ কিছুদিন কয়েকজন পরিচ্ছন্নকর্মী নিযুক্ত করে। সম্প্রতি তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পৌরকর্তা বলেছেন, তহবিল সংকট। তা ছাড়া যে প্রত্যাশায় লোকবল দেয়া হয়েছিলো তা পূরণের ন্যূনতম আলামত পরিলক্ষিত হয়নি। তিনি হাসপাতালের পরিবেশ স্থায়ীভাবে দূষণমুক্ত রাখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধিতে নিয়ম মানার অনুরোধ জানিয়েছেন।

হাসপাতালে দুর্গন্ধ হবে না তো ফুলের সুগন্ধ ছড়াবে? কেউ কেউ এ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। যে সমাজে নিয়মনীতির বালাই নেই, নেই জবাবদিহিতা, সেই সমাজে এ ধরনের প্রশ্ন অবান্তর নয়। তাই বলে সকলে মিলে পরিবেশ দূষণ করতে হবে? নিজেদের বাড়িটা যেভাবে পরিষ্কার রাখা হয়, সেভাবে কেন আমরা জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পরিষ্কার রাখার কথা ভাবতে পারি না? কারণ, হাসপাতাল পরিষ্কার করার জন্য লোকজন রয়েছে। আমি আর কতোটুকুই বা থাকবো। আমি অপরিষ্কার করবো, পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিতরা পরিষ্কার করবে। এরকম যুক্তি দেখিয়ে আমরা অনেকেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিই। অথচ একবারও ভাবিনে, আমাদের সমাজ তথা দেশের সামর্থ। এ প্রসঙ্গেও কেউ কেউ হয়তো সরকারের তথা সরকারি লোকজনের লুটপাটের কথা বলে দায়মুক্ত হতেই পারেন। এক্ষেত্রেও পাল্টা প্রশ্নটি যুক্তিযুক্ত। তিনি কি সরকার গঠনে রায় প্রদানে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন? নাকি ভোটের মূল্যটা না ভেবেই রায় দিয়ে শুধু সরকারকে দূষছেন?

অবশ্যই সকলকে সচেতন হতে হবে। শুধু পরিবেশ দূষণমুক্ত করার জন্যই নয়, সরকার গঠন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই সচেতন হলে কেবল হাসপাতালের নয় গোটা দেশের চিত্রটাই পাল্টে যাবে নাকি? বদলাতে হবে আমাদের মানসিকতা। সমাজের সচেতনমহলকেই অধিক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া জরুরি। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বাস্তবমুখি পদক্ষেপ প্রয়োজন। হাসপাতালে নির্দিষ্ট সময়ে দর্শনার্থীর প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ করে বাহিরাগতদের অনুপ্রবেশ রুখতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published.