সংসদ রেখে নির্বাচন কঠিন হবে : ইসি

 

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠুভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে তাদের এ টেনশন। কয়েক দিন পরই নির্বাচনের কাউন্ট-ডাউন শুরু হবে। নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ততোই বাড়ছে। রাজনৈতিক মহলেও নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কী হবে এনিয়ে জল্পনা-কল্পনা কম হচ্ছে না। মূলত নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও সমঝোতা না হওয়া এবং সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় নির্বাচন কমিশনে উদ্বেগ কাজ করছে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন নাকি সংসদ ভেঙে নির্বাচন হবে সে বিষয়ে এখনও অন্ধকারে কমিশন। বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে পারছে না কমিশন। সংসদ বহাল থাকলে এক ধরনের এবং সংসদ ভেঙে গেলে আরেক ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে কমিশনকে। এছাড়া সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচন হলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেইং ফিল্ড) নির্ধারণ নিয়েও হিমসিম খাচ্ছে কমিশন। এসব কারণে নির্বাচনের তফসিল ও ভোট গ্রহণের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেনি ইসি। কমিশনের আশা, চরম সংকটময় পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ নেবে এবং তাদের মধ্যে সমঝোতাও হবে। এ জন্য শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ আগামী ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে কমিশন। এর পরই নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসি।

সংবিধানের ১২৩(৩)(ক) অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। এ হিসাবে আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারি- এ ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচনী সময় হিসেবে গণ্য হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে গেলে ওইদিন থেকে আরও ৯০ দিন পর্যন্ত নির্বাচনের বিধান রয়েছে সংবিধানে।

ইসির মতে, সবদলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চেয়ে তাগাদা দিয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে নির্বাচন হলে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ কষ্টসাধ্য হবে। নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা চালাতে পারে বলেও আশংকা করছেন তারা। অন্যদিকে কমিশনের বিরুদ্ধে ১৮ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর অব্যাহত প্রচারণা আরও ব্যাপকতা লাভ করবে। এতে কমিশনারদের ব্যক্তিগত ইমেজ নষ্ট হবে। গ্রহণযোগ্যতা হারাবে কমিশন। ইসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহনেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কমিশন। এরপর বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেবে। হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। সব দলের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে চায় কমিশন। আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করবে না তারা। আইন অনুযায়ী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি কমিশনের রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিল ও ভোট গ্রহণের বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা নির্বাচন সংক্রান্ত ও আনুষঙ্গিক আইনগুলো পর্যালোচনা করছি। সময় হলেই সব পরিষ্কার হবে।

অন্য নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজের মতে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেয়া নির্বাচন কমিশনের জন্য দুরূহ ব্যাপার হবে। সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করলে কমিশনের জন্য সহজ হবে বলেও মনে করেন তিনি। গতকাল রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তবে সংসদ বহাল থাকবে নাকি ভেঙে নির্বাচন হবে তা নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক দলগুলো। আর সমঝোতাও হতে হবে তাদের (রাজনৈতিক দল) মাধ্যমে। সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচন করা কঠিন হবে মন্তব্য করে আবু হাফিজ বলেন, সংসদ বহাল থাকলে এক রকম পরিবেশ থাকবে এবং সংসদ না থাকলে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে। কোন সময়কে বিবেচনায় নিয়ে আপনারা আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের হাতে এখনও অনেক সময় আছে। যদি দেখি সংসদ থেকে নির্বাচন হচ্ছে তাহলে সেভাবে প্রস্তুতি নেব আর যদি সংসদ ভেঙে হয় তাহলে অন্যভাবে প্রস্তুতি নেয়া হবে। এতে কমিশনের কোনো অসুবিধা হবে না। আর সব কিছু পর্যালোচনা করে তারপর আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে। নির্বাচনের সময় যা যা করণীয় তা-ই করা হবে। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সেনাবাহিনী নামানো হবে। আর সব দলের অংশগ্রহণে আমরা নির্বাচন করতে চাই।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিরোধীদলীয় জোট বর্জন করলে একই অবস্থা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও হতে পারে বলে আশংকা করছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।

রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে কমিশন সংকটে পড়বে মন্তব্য করে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে আইন অনুযায়ী নির্বাচন করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংকট রয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে তার প্রভাব কমিশনের ওপর পড়বে। তখন পরিস্থিতি যাই হোক না কেন কমিশন সংবিধানের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।

সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে সরকার ও বিরোধীদলীয় জোট। তাই এ ইস্যুটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে সমাধান হবে নাকি ভালোয়ভালোয় বিষয়টির সুরাহা হবে তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার অন্ত নেই। এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন নিয়ে কমিশন কোনো অস্বস্তিতে আছে কিনা জানতে চাইলে কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, কমিশন কোনো অস্বস্তিতে নেই। রাজনৈতিক দলগুলো রাস্তায় দর কষাকষি করছে। অস্বস্তিতে থাকলে তারাই থাকতে পারেন। সংসদ ভেঙে নাকি বহাল থাকবে তা ইসির সঙ্গে পরামর্শ করা হবে- প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের এমন মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ প্রশ্নটি ওনাকে (ইমাম) করাই উচিত। এটি আমাদের কোনো বিষয় নয়। তবুও আমাদের পরামর্শ চাইলে আমাদের জন্য যেটা সুবিধা হবে তাদের (সরকার) সে পরামর্শ দেয়া হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এরই মধ্যে ভোটার তালিকা, সীমানা পুনর্বিন্যাস ও আইনের সংশোধনীর কাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে ভোটার লিস্ট প্রিন্ট হচ্ছে। কমিশন এখন পর্যন্ত যত কাজ করেছে তা যথার্থ। আর আমরা এমন কোনো কাজ করছি না যেটা বলা যাবে না। তবে কমিশনকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে, যা তথ্যভিত্তিক নয় বলে জানান তিনি।

প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে: কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা কমিশনের কাছে স্পষ্ট না হলেও নির্বাচনী প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় শাখা, নির্বাচন সহায়তা ও সরবরাহ অধিশাখার কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ নির্বাচনের জন্য ৩৩ হাজার মনোনয়ন ফরমসহ ১৭ ধরনের কয়েক লাখ নির্বাচনী ফরম ও ১৬ ধরনের কয়েক লাখ প্যাকেট মুদ্রণে কার্যাদেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভোট কেন্দ্র নির্ধারণে এ সপ্তাহে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া ৬ লাখ ৪৮ হাজার স্ট্যাম্প প্যাড, ৯০ হাজার ব্রাশ সিল, ১১ লাখ ২৩ হাজার মার্কিং সিল, ৬ লাখ ৪৮ হাজার অফিসিয়াল সিল তৈরির কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। দুই দফায় এসব সামগ্রী সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী ২৪ অক্টোবরের মধ্যে এসব সামগ্রী কমিশনে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তারা।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠিত হয়। প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হয় একই বছরের ২৫ জানুয়ারি। এ হিসাবে আগামী ২৪ জানুয়ারি সংসদের মেয়াদ ৫ বছর পূরণ হবে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে গেলে ওইদিন থেকে ৯০ দিন পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *