সংশোধনী কেন্দ্রে বিমর্ষ ঐশী এখন নামাজি

ছোট ভাই ওহি খালার হেফাজতে : তাকে দেখার ইচ্ছে ব্যক্ত

 

 

স্টাফ রিপোর্টার: ড্যান্স পার্টি, ডিজে পার্টি আর রঙিন দুনিয়ার বন্ধুদের নিয়ে দিন-রাত আড্ডা দেয়া ঐশী রহমান হঠাত্ করেই নামাজ পড়তে শুরু করেছে। মদ, গাঁজা, ইয়াবা সেবনে অভ্যস্ত ঐশী এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। মাদকের কথা সে শুনতেই পারছে না। এ মাদকই তার বাবা-মাকে খুন করেছে। তাই মাদক থেকে দূরে থাকতে চায় ঐশী। জীবনে আর কখনোই মাদকের কাছে যাবে না বলে শপথ করেছে। গতকাল থেকে ঐশী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় শুরু করেছে। গতকাল সোমবার কাউকে কিছু না জানিয়ে ফজরের নামাজ পড়তে শুরু করে ঐশী। তার রুমে থাকা বন্ধুরাই নয়, গাজীপুরের কোনাবাড়ির কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়করাও ঐশীর এই কাণ্ডে বিস্মিত হন। শুধু তাই নয়, গতকাল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে ঐশী। এদিকে গত রোববার রাতে খালা সুবর্ণার তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়েছে ঐশীর একমাত্র ভাই অহিকে। আপাতত সেখানেই থাকবে অহি।

গাজীপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক বেগম লুত্ফুন্নেছা বলেন, কেমন যেন বদলে গেছে ঐশী। সোমবার সঠিক সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছে। সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করছে। নিজের অপরাধবোধ আর এতিম হওয়ার বেদনা সে হাড়ে হাড়ে বুঝছে। তার রুমে থাকা অন্য মেয়েদের সে বলেছে, আর জীবনে কোনোদিন মাদকের ধারে কাছেও যাবে না। এই মাদকই তার বাবা-মাকে খেয়েছে। কোনোদিন সুযোগ পেলে ছোট ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করতে চায় সে। ছোট ভাইয়ের জন্য তার মনও কাঁদে।

ছোট ভাই ঐহীর জন্য মন খারাপ নিহত পুলিশ দম্পতির কন্যা ঐশী রহমানের। ঐহীকে দেখার জন্য কিশোরী সংশোধনী কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে ঐশী। কার কাছে, কোথায়, কেমন আছে ঐহী তাও জানতে চেয়েছে তাদের কাছে। রিমান্ড শেষে গাজীপুরের কোনাবাড়ির কিশোরী সংশোধনী উন্নয়ন কেন্দ্রে নেয়ার পর সোমবার পর্যন্ত কোনো স্বজন তার সাথে দেখা করেননি। সেখানকার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঐশী রহমান মাঝে মধ্যে একাকী বসে চিন্তায় মগ্ন থাকছে। রোববার রাত ১২টার পর সে ঘুমাতে যায়। তাকে ধর্মীয় ও গল্পের বই দিলেও সেগুলো পড়েনি। উল্টে-পাল্টে দেখে রেখে দিয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে থাকা ঐশী রহমানের বন্ধু রনি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। ওইসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া ঐশী রহমান ও কাজের মেয়ে সুমির দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের নজরদারিতে রেখে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। পুলিশ জানায়, গত শনিবার রাতে ঐশী রহমানকে গাজীপুরের সংশোধনী কেন্দ্রে নেয়া হয়। সেখানে তাকে অ্যামব্রয়ডারি (সেলাই) প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সংশোধনী কেন্দ্র সূত্র জানিয়েছে, সোমবার ঐশী রহমান দ্বিতীয় দিনের মতো প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। সকাল ৯টায় অ্যাসেম্বলি করার পর বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ক্লাস করানো হয়। পুরো ক্লাসেও সে অংশ নেয়। ক্লাসে তার যথেষ্ট মনোযোগ ছিলো না। মাঝে মধ্যেই গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকছিলো। তবে শিক্ষকরাও তার প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাচ্ছেন। কেন্দ্রের মধ্যে ছোট একটি খেলার মাঠ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন বিকেলে সেখানে সবাইকে নিয়ে কাউন্সিলিং করা হয়। ঐশীও সোমবার বিকেলে মাঠে নেমে ঘোরাফেরা করেছে।

খাওয়া-দাওয়া: বাবা-মায়ের সাথে থাকতে ঐশী রহমান এতোদিন খেয়েছে উন্নত মানের খাবার। বাবা-মায়ের কাছে যা চেয়েছে তা-ই পেয়েছে। ইচ্ছামতো খরচ করেছে টাকা। বুঁদ হয়ে থেকেছে সর্বনাশা নেশায়। ইচ্ছামতো চলেছে বন্ধুদের সাথে। হঠাৎ চার দেয়ালের মধ্যে, নিয়মের মধ্যে পড়ে একটু নয়, অনেকটাই মানসিকভাবে বিপর্যন্ত দেখাচ্ছে তাকে। মেনে চলতে হচ্ছে সংশোধনী কেন্দ্রের নিয়মনীতি। সেখান থেকে যে খাবার দেয়া হচ্ছে তা না খেয়েও উপায় নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথমে সবারই এ নিয়মের মধ্যে চলতে বা মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হয়। ঐশী রহমানেরও সাধারণ খাবার খেতে অনীহা থাকলেও খেতে হচ্ছে। সোমবার সকালের নাশতায় ভাত, সবজি ডাল ছিলো। নাশতা খেয়েই সে ক্লাসে যায়। দুপুরে খেতে দেয়া হয় মাছ, সবজি, ডাল ও ভাত। বিকালে নাশতা এবং রাতে দেয়া হয় সবজি, ডাল ও ভাত। সবই পরিমাপমতো দেয়া হচ্ছে। ওই খাবার কোনো রকম খাচ্ছে ঐশী। কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রের উপপরিচালক লুৎফুন্নেছা সোমবার বিকালে বলেন, গত রোববার রাতে ধর্মীয় একটি বই নিয়ে নাড়াচাড়া করে রেখে দিয়েছে। রাত ১২টা পর্যন্ত সে মন খারাপ করে বসেছিলো। রাত ১২টার পর ঘুমাতে যায়। খাওয়া-দাওয়া করছে সে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হঠাৎ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় এসে আটকাবস্থার মধ্যে পড়লে খাওয়া-দাওয়া করতে সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে তা দু-একদিনের মধ্যে সেটা ঠিক হয়ে যাবে।

তার কোনো স্বজন তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো কি-না জানতে চাইলে উপপরিচালক বলেন, না। সোমবার বিকাল পর্যন্ত কেউ আসেনি। তবে ঐশী বলছিলো তার এক খালা ও তার ভাই ঐহীর কথা। ওই খালা তাকে খুব আদর করতেন বলে সে জানায়। ঐহীর জন্য তার মন খারাপ। চিন্তা করছে ঐহীর জন্য।

চলাফেরায় বাধা দেয়ার কারণে ঐশী রহমান গত ১৪ আগস্ট খুন করে বাবা পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কার্যালয় লাগোয়া রাজধানীর ২, চামেলীবাগের চামেলী ম্যানশনের ৬ তলার ৫/বি নম্বর ফ্ল্যাট থেকে গত ১৬ আগস্ট পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়। বাবা-মাকে খুন করার পর ঐশী পালিয়ে যায়। ১৭ আগস্ট নিজেই পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার পর তাকে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ অভিযানে নামে। পরে কাজের মেয়ে সুমি ও বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে গ্রেফতার করা হয়। পাঁচদিনের রিমান্ড শেষে শনিবার ঐশী দোষ স্বীকার করে আদালতে খুনের দায় স্বীকার করে। সুমিও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। রনিকে ফের পাঁচদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। ঐশী স্বীকার করেছে, বন্ধু জনির পরামর্শে সে বাবা-মাকে খুন করে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর বলেন, ঐশী ও সুমির জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। রনি বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *