দামুড়হুদা উপজেলায় এখনও পর্যন্ত কোন মাদরাসায়ই নির্মাণ করা হয়নি শহীদ মিনার : ভাষা শহীদদের প্রতি অবজ্ঞা না-কী কর্তৃপক্ষের উদাসিনতা?

বখতিয়ার হোসেন বকুল: চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গুটিকয়েক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো মাদরাসায়ই নির্মাণ করা হয়নি শহীদ মিনার। দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৪৭ বছর। আর ভাষা আন্দোলন হয়েছে তারও বেশ কয়েক বছর আগে। ৪৭ বছর দেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও এখনও পর্যন্ত কোনো উপজেলার ১১টি মাদরাসার একটিতেও নির্মাণ করা হয়নি শহীদ মিনার। এ বিষয়ে এলাকার সচেতন মহল মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, স্কুল কলেজের ন্যায় বর্তমানে মাদরাসা পর্যায়েও সরকারিভাবে সকল সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। মায়ের ভাষার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে এটাই বাস্তবতা। তারা অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, একুশ ফেব্রুয়ারি ওই দিনকে ঘিরেই আমাদের যতো আয়োজন। অথচ স্বাধীন দেশে মাদরাসা পর্যায়ে এখনও পর্যন্ত শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি এ বিষয়ে যেন কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই ভেবে দেখা প্রয়োজন। তারা আরও বলেছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনেকটা ঘটা করে সম্মাননা পদক দিয়ে থাকেন। যা অনেকটা আলোর নিচেই অন্ধকার প্রবাদের মতোই। মাতৃভাষার প্রতি কোনো ধরণের অবজ্ঞা বা অবহেলা মেনে নেয়া হবে না। কারণ একুশ বাঙালি জাতির আদিসত্ত্বা, একুশ আমাদের অহঙ্কার।
এলাকা সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার যে কয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে তার অধিকাংশই চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজি আলী আজগার টগরের ব্যক্তিগত অর্থায়নে। এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাকী সালাম জানান, উপজেলার মোট ১১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে জুড়ানপুর, গোপালপুর ডিজিএম শান্তিপাড়া, পাটাচোরা, সাড়াবাড়িয়া, কালিয়াবকরি এবং রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে। তিনি আরও বলেছেন, প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও প্রতিটি স্কুলেই লোহার রড দিয়ে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার তৈরি করে শহীদ দিবস পালন করা হবে।
দামুড়হুদা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল মতিন জানান, উপজেলার মোট ৪৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮টিতে শহীদ মিনার আছে। একটিতে কাজ চলছে। এছাড়া ১১টি মাদরাসার মধ্যে একটিতেও শহীদ মিনার নেই। প্রতিটি বিদ্যালয়েই শহীদ মিনার থাকা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা চেয়ারম্যান মাও. আজিজুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে লেখালেখি না করাটাই ভালো। তারপরও অর্থের একটি বিষয় আছে। তাছাড়া মাদরাসা পর্যায়ে ওইভাবে অভ্যস্থ নয়। বিধায় শহীদ মিনার নির্মাণের বিষয়টি কেউই ভেবে দেখেনি।
দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রফিকুল হাসান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, কোনো মাদরাসায় শহীদ মিনার নেই এটি খুবই দুঃখজনক। উপজেলার সকল প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদরাসায় শহীদ মিনার নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
নতুন প্রজন্মের জন্য একুশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো : একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি বর্তমানে শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে একযোগে পালিত হচ্ছে। বঙ্গীয় সমাজে বাংলাভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালির আত্ম-অন্মেষায় যে ভাষা চেতনার উন্মেষ ঘটে, তারই সূত্র ধরে বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে। ওইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসেন। পুলিশ তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে আবুল, বরকত, জব্বার, সালামসহ কয়েকজন ছাত্র-যুবক নিহত হন। হত্যাকা-ের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাশহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। দোকানপাট, অফিস আদালত ও গণপরিবহণ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে জড়ো হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যেই মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে তোলা হয় একটি স্মৃতিস্তম্ভ। যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। ওই ঘটনার মধ্যদিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তখন থেকে প্রতিবছর এ দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালিরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বীকৃতি লাভ করে। কানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার জন্য ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে আবেদন জানান। এরপর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *