দামুড়হুদায় ট্রেড শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনির রোষানলে শিক্ষার্থীরা : বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকেরা

 

তাছির আহমেদ: দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ামক হিসেবে সব থেকে বড় কাজ করে। তাই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের কোনো বিকল্প নেই। এ বাস্তবতাকে অনুধাবন করে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড আভ্যন্তরীণ ও বিদেশের চাকরির জন্য দক্ষ জনশক্তি এবং তাদের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে একাধিক জরিপ ও অনুরূপ অন্যান্য প্রতিবেদন ও তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে মাধ্যমিক পর্যায়ের সাধারণ শিক্ষা ও ভোকেশনাল শিক্ষার সমন্বয়ে ১৯৯৫ সাল থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করে। এ শিক্ষাক্রমের সাথে নবম ও দশম শ্রেণিতে শুধুমাত্র ট্রেড বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও শিক্ষার্থীরা জাতীয় দক্ষতায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় মান অর্জন করে। এ শিক্ষাক্রম সম্পন্ন করে একজন শিক্ষার্থী সরাসরি দক্ষ জনশক্তি হিসেবে দেশে ও বিদেশে চাকরিতে প্রবেশ এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হওয়াসহ উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। ক্রমপরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশে ও বিদেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও প্রয়োজন আরও যুগোপযোগী করার।

অথচ এ শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তরালে শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনির রোষানলে মাসভর টিউশনির টাকা জোগাড় করতে শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা পড়ছেন বিপাকে। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় এ শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় থাকা মাধ্যমিক স্কুলগুলোর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। এ শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাওয়া ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট টিউশনির ফাঁদে টানা দু বছরের খরচ জোগাতে অভিভাবকদের প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও ভুক্তভোগী অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দানা বেঁধেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলায় সর্বমোট তিনটি বিদ্যালয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (ভোকেশনাল) শিক্ষাক্রম চালু আছে। এর মধ্যে দামুড়হুদা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে চালু রয়েছে তিনটি ট্রেড কোর্স। যথাক্রমে ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিজারভেশনে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৫৬ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দান করছেন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর মুনছুর আলী ও হারুন অর রশিদ। ড্রেস মেকিং অ্যান্ড টেইলারিঙে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৫৫ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দান করছেন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর রফিক উদ্দিন ও মিকাইল হোসেন। জেনারেল ইলেকট্রনিক্সে  নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করছেন একমাত্র খণ্ডকালীন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর ওসমান আলী। দামুড়হুদা পাইলট উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে চালু রয়েছে তিনটি ট্রেড কোর্স। জেনারেল ম্যাকানিক্সে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৫৮ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করছেন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর তুহিন উদ্দিন ও ফারুক হোসেন। বিল্ডিং মেইনটেন্যান্সে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৫৬ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করছেন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর জাহিদুল ইসলাম ও আসাদুজ্জামান। জেনারেল ইলেকট্রিক্যালে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৫৮ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দান করছেন একমাত্র ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর সোলায়মান কাদির। কার্পাসডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চালু রয়েছে দুটি ট্রেড কোর্স। ইলেকট্রিক্যাল মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কসে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করছেন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর আনোয়ার হোসেন ও ফারুক হোসেন। সিভিল কনস্ট্রাকশনে নবম ও দশম শ্রেণিতে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করছেন একজন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর আব্দুল হানান।

এ সকল প্রতিটি ট্রেডে (ট্রেড-১, ট্রেড-২) নবম শ্রেণিতে ৪শ ও দশম শ্রেণিতে ৪শ নম্বর বিদ্যমান আছে। এ নম্বর বিন্যাস হয় তত্বীয় ধারাবাহিক মূল্যায়নে ৮০ চূড়ান্ত মূল্যায়নে ১২০ এবং ব্যবহারিকে ধারাবাহিক মূল্যায়নে ১০০ ও চূড়ান্ত মূল্যায়নে ১০০ মোট ৪০০ নম্বর। তত্ত্বীয় চূড়ান্ত মূল্যায়নের ১২০ নম্বর বাদে বাকি ২৮০ নম্বর বণ্টন বিন্যাস নিয়ন্ত্রণ থাকে এ ট্রেড শিক্ষকদের হাতে। অনুরূপভাবে দশম শ্রেণিতেও একইভাবে এ নম্বর বণ্টনের বিধান রয়েছে। শিল্প কল-কারখানা বাস্তব প্রশিক্ষণের ১০০ নম্বর বণ্টন বিন্যাসও এ ট্রেড শিক্ষকেরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত সর্বশেষ পরিপত্রে ৬.৪.১ ক অনুচ্ছেদে বর্ণিত প্রতিটি ট্রেডে ৩০ জন ছাত্রছাত্রী একটি ব্যাচের জন্য প্রযোজ্য এবং আবশ্যকীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুটি ট্রেড থাকতে হবে। প্রতিটি ট্রেডে দুজন ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগ থাকারও বিধান রয়েছে।

স্কুলের শিক্ষার্থীরা ৯ম শ্রেণিতে উত্তির্ণ হলে ভোকেশনাল বিভাগের শিক্ষকরা নাকি শিক্ষার্থীদেরকে ভোকেশনালে পড়তে উৎসাহ যোগায়। তার কারণ হিসেবে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদেরকে ভোকেশনাল বিভাগে বেশি বেশি ভর্তি করতে পারলে ওই শিক্ষার্থীর সারা বছর প্রাইভেট টিউশনির টাকাগুলো ওই ভোকেশনাল শিক্ষকের বাড়ি দিয়ে আসবে। এলাকার শিক্ষার্থীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও জানিয়েছে, ভালো ফলাফলের আশায় তারা অনেকটা বাধ্য হয়ে ভোকেশনাল শিক্ষকদের কাছে নবম শ্রেণি থেকেই প্রাইভেট পড়া শুরু করে। এ সকল শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা ভোকেশনাল শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষকরা আশানুরূপ নম্বর দেন না। তাই তারা বেশি বেশি প্রাইভেট পড়ে বেশি বেশি নম্বর পাওয়ার আশায়।

সচেতন অভিভাবকমহল জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের কৌশলে দল বেঁধে বাড়িতে ডেকে নিয়ে এ সকল শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা না হলে শিক্ষকদের এ ব্যারাম কখনও সারবে না। এ ব্যারামের কারণে অল্প মেধাবী ও দূরন্ত প্রকৃতির শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় ঢিলঢাল দিয়ে বছর ভর স্যারের বাড়িতে প্রাইভেট পড়ে এ সকল স্যারের নিকট বেশি বেশি নম্বরের দাবি অটুট রাখে। এ সকল শিক্ষার্থীদের কৌশলে শিঁকলে বেঁধে না রেখে তাদেরকে বাঁধনমুক্ত করলে সে তার সুবিধানুযায়ী শিক্ষকের নিকট প্রাইভেট পড়ে আরও ভালো ফলাফলসহ বেশি বেশি জ্ঞানার্জন করতে পারবে। সেই সাথে স্কুল পরিচালনা পর্ষদের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্যের সাথে নিয়মবহির্ভুত জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৯৫’র অধীনে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।