খুলনায় ৫ মাসে ৩২৫ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট

স্টাফ রিপোর্টার: গত ৫ মাসে খুলনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩২৫ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ তাদের অঙ্গ-সংগঠনের ব্যানারে থাকা ঠিকাদাররা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাগিয়ে নিয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), খুলনা ওয়াসা, ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো), এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের এসব কাজের দরপত্র কিনে বাধার কারণে জমা দিতে না পারায় সাধারণ ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ হন। এ নিয়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

সিন্ডিকেটভুক্ত প্রভাবশালীদের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পিপিআর-২০০৮ যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি বলেও অভিযোগ ওঠে। একই কারণে কেসিসির সাড়ে ৫ কোটি টাকার একটি দরপত্র বাতিল করা হলে তা নিয়েও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পিপিআর অনুযায়ী সিন্ডিকেট গঠন অবৈধ হলেও সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়টিও স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণে নিচ্ছে না বলে সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ। সর্বশেষ ২ অক্টোবর এলজিইডির ১০ কোটি টাকার কাজের দরপত্র সরকার সমর্থক ঠিকাদার সিন্ডিকেটের দখলে গেছে।

পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী বিডার পক্ষে প্রতি কাজে কমপক্ষে ৩টি দরপত্র জমা থাকার বিধান রয়েছে। তবে, সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দরপত্রের ক্ষেত্রে পিপিআরের নির্দেশিত ৫টি মেথডের মধ্যে ওপেন টেন্ডারিং মেথডকে গুরুত্ব দেন। ফলে সিন্ডিকেটের বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়া সহজ হয় বলে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা জানিয়েছেন। পিপিআর অনুযায়ী কোনো দরপত্র বাতিল হলে সে ক্ষেত্রে অসাধু ঠিকাদারদের কালোতালিকাভুক্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু খুলনায় বিভিন্ন সময় দরপত্র বাতিল করা হলেও সংশ্লিষ্টরা কোনো ঠিকাদারের নাম কালোতালিকায় নিতে পারেননি বলেও ঠিকাদারদের অভিযোগ। জার্মান অর্থায়নে কেসিসি এলাকার খাল খনন প্রকল্পের প্রায় ২৩ কোটি টাকার দরপত্র সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা কিনতে পারেনি। ১৯ আগস্ট জমা দেয়ার দিন ঠিকাদারদের মধ্যে তাই হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ৩০ জুলাই সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার দরপত্র সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মহানগরীর ‘গল্লামারী সেতু’ নির্মাণের কাজ পেতে ১৪ জন দরপত্র ক্রয় করলেও সিন্ডিকেটের দাপটি ভূমিকার কারণে ১১ ঠিকাদারই জমা দিতে পারেনি। ২৯ জুন ওজোপাডিকো ৩০ কোটি টাকার দরপত্র ভাগবাটোয়ারা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুতের তার ও পোল সরবরাহের জন্য ৯ মে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর থেকেই বিদ্যুতভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারীরা পাহারা বসায় এবং দরপত্র ক্রয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের বাধা দেয়। ৩০ এপ্রিল ওজোপাডিকোর ২১ শহর প্রকল্পের প্রায় ১৫ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। ২ আগস্ট দিঘলিয়া উপজেলার বাতিভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণে এলজিইডির ৫১ লাখ টাকার দরপত্র সিন্ডিকেট করে বাগিয়ে নেয়া হয়। ঠিকাদাররা ১৯টি দরপত্র কিনলেও বাধার কারণে তা জমা দিতে পারেননি। ফলে সিন্ডিকেটের মাত্র ৪টি দরপত্র জমা পড়ে। ৫ সেপ্টেম্বর কেসিসির খাল খনন প্রকল্পের ৫ গ্রুপের প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকার কাজ সরকার সমর্থক ঠিকাদার সিন্ডিকেট দখলে নেয়। এ কাজের জন্য ৫টি গ্রুপে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হয়। আর জমা পড়ে ৯টি।

ডুমুরিয়া উপজেলার রূপ গজেন্দ্রপুর, মাগুরঘোনা, কুলবাড়িয়া, শিবনগর, লাঙ্গলমোড়া ও তেলিখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুনঃনির্মাণ কাজের ৩ কোটি ৬ লাখ টাকার দরপত্রও ১৫ মে সিন্ডিকেটের দখলে যায়। ১০ সেপ্টেম্বর কেসিসির রাস্তা ও ফুটপাত সম্প্র্রসারণ প্রকল্পের আরও সাড়ে ৪ কোটি টাকার পুনঃদরপত্রও আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি সিন্ডিকেট চক্রের দখলে গেছে।
একই প্রকল্পের প্রায় ২৫ কোটি টাকার কাজ গত ১৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। এ কাজ বণ্টন নিয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। একই দিন কেসিসি রাস্তা ও ফুটপাত সম্প্র্রসারণ প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার কাজ যুবলীগ নামধারী ঠিকাদাররা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। ১৪ আগস্ট কেসিসির বৈদ্যুতিক তার, এনার্জি বাল্ব সরবরাহ ও ওয়াসার নলকূপের মালামাল ক্রয়, পাম্প মেরামত, ওয়াটার ফিল্টার ক্রয়ের ১ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে গত ১ মাসে প্রায় ৭০ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নামধারী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে গেছে। ১০টি ওভারহেড ট্যাংকি ও ৭টি রিজার্ভ ট্যাংকি নির্মাণে খুলনায় ওয়াসার প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ ১১ অক্টোবর ভাগবাটোয়ারা করে নেয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট। এডিবির অর্থায়নে এ কাজের জন্য ৩১ জুলাই প্রায় ২০০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সময়ে ১০টি দরপত্র বিক্রি হয়। আর সিন্ডিকেটের ভূমিকার কারণে ৫টি দরপত্র জমা পড়ে। বিডিসিএল মনিকো-ডেনকো জয়েন্ট ভেঞ্চার, প্রতিভা-নাভানা জয়েন্ট ভেঞ্চার, রানকেন অ্যান্ড ম্যাটল জয়েন্ট ভেঞ্চার, চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং চায়না ডিও ইঞ্জিনিয়ারিং নামে প্রতিষ্ঠানগুলো এ দরপত্র জমা দেয়। ১৪ আগস্ট ওয়াসার নলকূপের মালামাল ক্রয়, পাম্প মেরামত, ওয়াটার ফিল্টার ক্রয় করার জন্য ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়।

আইডিবির অর্থায়নে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার মশিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বটিয়াঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিণটানা সরকারি প্রাথমিক, দাকোপের খোলাখাটাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডুমুরিয়ার আকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পেড়িখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিলপাবলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কয়রার হোগলা শেওড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একই প্যাকেজে নতুন ভবন নির্মাণ কাজের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহ্বান করা হয়। বুধবার ছিলো এ কাজের দরপত্র জমা দেয়ার দিন। এর আগ পর্যন্ত এ কাজের জন্য ঢাকায় এটিসহ ১১টি দরপত্র বিক্রি হয়। ২ অক্টোবর খুলনা এলজিইডি ভবনের আশপাশে সিন্ডিকেটভুক্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারীদের অপতৎপরতায় সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র কিনেও তা জমা দিতে পারেনি। এর ফলে নির্ধারিত সময় শেষে বাক্সে মাত্র ২টি দরপত্র পাওয়া যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *