কোর্টচাঁদপুর তালসার গ্রামের আইজদ্দিন : সাপ আর বানরের খেলা দেখিয়েই জীবন জীবিকা

মনজুরুল আলম:শুধু সাপ আর বানরের খেলা দেখিয়ে ৩৫ বছর জীবন জীবিকা করে আসছেন ঝিনাইদহের আইজদ্দিন। তার বয়স এখন ৬৫ বছর। এ বয়সেও বিভিন্ন গ্রাম, পাড়া বা মহল্লায় বানর খেলা দেখিয়ে যে টাকা আর চাল পাওয়া যায় তা দিয়ে নিজের ওষুধ কেনার পাশাপাশি সংসারের খরচও কিছুটা চালান তিনি। তিনি কোটচাঁদপুর উপজেলার তালসার গ্রামের রিয়াজদ্দিনের ছেলে।

আইজদ্দিন জানান, বয়স ১৩ কী১৪ বছর হবে। পিতা আর ভাই একদিন আমার খুব বকলো এবং মারধর করলো। রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেলাম। কাছে যে পয়সা ছিলো ৩-৪ দিন পর সব শেষ হয়ে গেলো। একটা কাজ খোঁজার চেষ্টা করলাম। অনেক জায়গায় ঘুরলাম, কোনো কাজ পেলাম না। হঠাত দেখি ঝিনাইদহের বারোবাজারের নিকট কিছু বেদে টোল ফেলে আছে। সেখানে গেলাম। ভাবলাম তাদের সাথে কাজ করবো আর খাবো। কিন্তু কাজ তো দূরের কথা,তারা আমার কোনো কথাই শুনলো না। তারপরও তাদের ওই আস্তানাতেই বেশ কয়েক রাত থাকলাম। একদিন তাদের মধ্যে বয়স্ক বেদে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। তিনি আমার পরিচয় জানার পর আমাকে বাড়ি পাঠানোর জন্য অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরে আসার কোনো আগ্রহই করলাম না। আরো দু দিন কেটে গেলো। এক দিন তারা আমার খাবার দিলেন। সেই থেকে তাদের সাথে থাকতে লাগলাম। তাদের নিকট থেকেই কিছু মন্ত্রতন্ত্রের কাজ শিখতে শুরু করলাম। একে একে আট বছর হয়ে গেলো। বিয়ের বয়স হলো। তাদের মধ্যেই এক মেয়েকে বিয়ে করলাম। এক ছেলে হলো। এর মধ্যে বাড়ির সবাই জেনে গেছে আমি বেদে দলে আছি। সেখানেই বিয়ে করেছি, আমার এক ছেলে সন্তান আছে। পিতাক্ষোভে জায়গা জমি বিক্রি করতে শুরু করলো। একে একে ৬৩ বিঘা জমি বিক্রি করে শেষ। আমিও লজ্জায় বাড়িতে আসতে পারিনে। বাড়ি ফিরে আসার সকল পথই আমার নিকট যেনো বন্ধ হয়ে গেছে। সেই ভেবে তাদের সাথে আরো মনোযোগ দিয়ে সাপ ধরা আর সাপের খেলা দেখাতে লাগলাম। কয়েক বছরেই আমার নিকট বিভিন্ন জাতের ৯৬টি বিষধর সাপ। বেদে পল্লিরসহ চারদিকে আমার নাম ছড়িয়ে পড়লো। এতোদিনে বাড়ির সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। এরই মধ্যে আমার গ্রামের এক ব্যক্তির সাথে হঠাত দেখা। সে জানালো আমার পিতা মারা গেছে। এ সংবাদ পেয়ে থেমে গেলাম। ভাবলাম পিতা থাকতে যখন দেখতে পারেনি। বাড়িতে আর ফিরে যাবোনা। কিন্তু হঠাত করেই আমার মা দেখি বেদে পল্লিতে। আমাকে বাড়িতে ফেরার জন্য বললো। যাদের সাথে ছিলাম তারা আমাকে বুঝালো। কয়েক দিন পরেই আমি বাড়িতে চলে গেলাম। এক মেয়ে হলো। ছেলে-মেয়েবিয়ে দিতে গিয়েও কতো সমস্যা। বারবার তাদের বিয়ে ভেঙে যেতে লাগলো। আমি মণ্ডল পরিবারের ছেলে হলেও বেদে বিয়ে করেছি। অবশেষে তাদের বিয়ে হলো। তিনি আরো জানান,পরিবারের ছেলে-মেয়ে সবাই আমার খুব ভালো জানে। ছেলে ভ্যান চালায়,তার সংসার আছে। এখন বয়স হয়েছে।কঠিন তেমন কাজ করতে পারিনে। কিন্তু শেষ বয়সে এসেও আমি বানর খেলা ছাড়তে পারেনি। তাই গ্রামে বা পাড়া মহল্লায় খেলা দেখায়। এখান থেকে যে টাকা পয়সা পাই, তা দিয়ে নিজের সংসার চলে না। চিকিৎসার খরচ কোনো রকম চলে।

তিনি জানান, আমার দেখে উঠতি বয়সীদের শিক্ষা নেয়া উচিত। পিতা-মাতা যে জন্যই বকুন না কেনো,সন্তানের ভালোর জন্যই তারা করে থাকেন। তিনি আরো জানান, আমিই বাস্তব প্রমাণ,জীবনের শুরু থেকে ২৪-২৫ বছর পর্যন্ত যে ধ্যান-ধারণা নিয়ে চলেছি। বাকি জীবন তার ওপর নির্ভর করেই জীবন জীবিকা নির্ভর করে।

 

Leave a comment

Your email address will not be published.