অবৈধ হচ্ছে ডেসটিনিসহ ৫৩টি এমএলএম কোম্পানির নিবন্ধন

স্টাফ রিপোর্টার: এমএলএম আইন পাসের পর ডেসটিনিসহ ৫৩টি কোম্পানির নিবন্ধন অবৈধ হচ্ছে। ফলে ওই সব কোম্পানি চলমান ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। কারণ নতুন আইনে এমএলএম ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু সক্রিয় কোম্পানিগুলোর কারও লাইসেন্স নেই। শুধু নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসা করছে। একই সাথে নতুনভাবে এমএলএম কোম্পানির নিবন্ধন দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হচ্ছে। আইন অনুযায়ী এমএলএম ব্যবসার জন্য আবেদনের পর কোম্পানির লাইসেন্স দেয়া হবে। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি অধিদফতর সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি (এমএলএম) নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। লাইসেন্স ছাড়া এ ব্যবসা করলে সর্বাধিক ১০ বছরের জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে আইনে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী সংসদ অধিবেশনে আইনটি পাসের জন্য সব প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হবে। কারণ এটিই হবে সরকারের শেষ অধিবেশন।

ইতঃপূর্বে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ে এমএলএম কোম্পানিগুলো। কোনো আইন না থাকায় এমএলএম কোম্পানির নামে ডেসটিনি ট্রি-প্লান্টেশন কর্মসূচির মাধ্যমে তিন হাজার ২৮৫ কোটি টাকা, যুবক নামের প্রতিষ্ঠানটি ২১৪৭ কোটি টাকা ও ১৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইউনিপে টু নামের প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরেও ছোট ছোট এমএলএম কোম্পানি প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ে। যে কারণে এসব দুর্নীতি বন্ধ করতে আইন প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে ডেসটিনিসহ ৫৩টি এমএলএম কোম্পানি সক্রিয় আছে। এর মধ্যে ডেসটিনির কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত চলছে। বাকি ৫২টি কোম্পানি দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, এমএলএম আইন গেজেট নোটিফিকেশনের দিন থেকে পুরনো সব এমএলএম কোম্পানি অবৈধ হয়ে যাবে। কারণ বিদ্যমান কোম্পানিগুলো শুধু নিবন্ধন নিয়েছে। কিন্তু নতুন আইনে এমএলএম কোম্পানি পরিচালনার জন্য লাইসেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেহেতু ৫৪টি কোম্পানির লাইসেন্স নেই। ফলে আইন কার্যকর দিন থেকে এসব কোম্পানি বিলুপ্ত ঘটবে।

এসব কোম্পানির মধ্যে ডেসটিনিও রয়েছে। ইতিমধ্যে ডেসটিনির সহযোগী আরও ১০টি কোম্পানির নিবন্ধন বাতিল করার উদ্যোগ গ্রহণ করে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই সব অঙ্গ কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়নি। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ডেসটিনি নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ার পর এসব সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাল নাগাদ রিটার্ন দাখিল করেছে। কাগজপত্রে আপডেট থাকায় তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়নি। কিন্তু এখন এসব কোম্পানির নিবন্ধন নতুন আইনে বাতিল হয়ে যাবে।

এদিকে নতুন আইনের একটি ধারায় উল্লেখ রয়েছে আইনটি কার্যকর হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে পুরনো কোম্পানিগুলো ব্যবসা পরিচালনার জন্য লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে। অবশ্য ওই সুযোগ নিতে পারবে পুরনো কোম্পানিগুলো।প্রতারণা, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে এবং নতুন আইন পাস না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এমএলএম কোম্পানির নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রেখে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। কিন্তু ওই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে এমএলএম আইন পাসের দিন থেকে। ইতঃপূর্বে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক ৬৯টি এমএলএম কোম্পানি নিবন্ধন ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৪৬(৩) ধারা অনুযায়ী বাতিল করে এবং ৩৪০(৫) ধারায় কোম্পানিগুলোকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বাতিলকৃত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইন্টা. টং চিং প্রডাক্টস, ওসান মার্কেটিং কোম্পানি, মাল্টি ফোকাস বিজনেস সিস্টেম, গানো ই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড, এমভিশন ড্রিম মার্কেটিং, জিলাশিয়ার (বিডি), গ্রিন একটিভ বিসনেস, লিবার্টি (বিডি) নেটওয়ার্ক মার্কেটিং, রয়েল ড্রিম ইন্টা. জিও নেট, দি এইম সলিউশন, ইভা টেলিকমিউনিকেশন, বারাবো আইটি ইন্টা. নিউফ ইন্টা. টুনি এন্ড টোনা একফোর্স, সুখ সারি (বিডি), উত্তরা গ্রীন সিটি, সোয়াব ইন্টা. হারবা লাইফ ইন্টা. এসকিটস, রয়েল ড্রিম, গৃহনির্মাণ মার্কেটিং, বিজ এইম কর্পোরেশন, মার্স মার্কেটিং প্রাইভেট, বন্ধন অ্যাসোসিয়েশন, গ্লেইন্স গেইন কোম্পানি, ফেইথ মার্কেটিং সিস্টেম, গুর্দান নেটওয়ার্ক, রয়েল ভিশন, গোল্ডেন ফেইদার, সিএমএস ইন্টা. বিডিলিংক সিস্টেমস, সানল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রোপার্টিজ, শাহানা এক্সপ্রেস, আল-বারাত কমিউনিকেশনস, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সিস্টেম, ইন্টা. ম্যাজিক বাংলা টেলিমিডিয়া, শেখ ব্রাদার্স শিপিং কর্পোরেশন, লাইফটাইম কনসেপ্ট, সেলফ ড্রিম, স্পাইডারস নেট ওয়ার্ল্ড ট্রেডার্স লি. ইন্টা. ইনফরমেশন টেকনোলজি সলিউশন লি. সরকার অর্গানিক শ্রিম্প সার্ভিস সেন্টার লি. উইস্টার্ন স্টিচ (বিডি) লি. সুইস ডিসিহাইফেলি ফ্যাশন লি., ফ্যামিলি মার্ট সুপারশপ লি. অ্যাপার্টমেন্ট মার্কেটিং লি. কৃষ্ণচূড়া লি. অ্যাসুরেন্স (বিডি), টার্গেট নেটওয়ার্ক মার্কেটিং, পারফেক্ট গেটওয়ে বাংলাদেশ, পেন্টা টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট, আইডিয়া মার্কেটিং কর্পোরেশন, শেফা টপস ও গ্লোবাল ২০২০ মার্কেটিং।

১৯৯০ সাল থেকে নগদ অর্থ দিয়ে সদস্য হয়ে অন্যকে সদস্য করার মাধ্যমে প্রাপ্ত কমিশন থেকে নিজের মূলধন তুলে নিয়ে পরবর্তী দীর্ঘ ধাপগুলোতে রীতিমতো কোটিপতি বনে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে পিরামিড পদ্ধতির এমএলএম ব্যবসা। কিন্তু পরে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সরকার নগদ অর্থ দিয়ে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। এরপর শুরু হয় পণ্য দিয়ে এ ব্যবসা।

উল্লেখ্য, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, পোলান্ড ও সুইডেনে পরিচালিত এমএলএম কোম্পানির বিরুদ্ধে অনেক আগে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *