প্রেমিকার আত্মহত্যার ঘণ্টা না পেরোতেই প্রেমিক হলো আত্মঘাতী

[ads1]

 

মেহেরপুর গাংনীর পল্লি বালিয়াখাট কিশোর-কিশোরীর প্রেমকাহিনী

মাজেদুল হক মানিক: মিথ্যা ভালোবাসা গাছের পাতার মতো যা কিছুদিন পরে ঝরে যায়। আর সত্যিকারের ভালোবাসা নদীর পানির মতো যা আলাদা করতে চাইলেও করা যায় না। গত ১ জানুয়ারি নিজের ডায়েরির পাতায় উপরোক্ত কথাগুলো লিখেছিলেন মেহেরপুর গাংনী উপজেলার বালিয়াঘাট গ্রামের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী তাসমিয়া আক্তার মুন্নি। ডায়েরির পাতার লেখাগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। লেখার প্রতিটি অক্ষরই সত্যি বলেই প্রমাণ করলো কিশোরী মুন্নি ও তার প্রেমিক একই গ্রামের মিনারুল ইসলাম (১৬)।

প্রেমিকা মুন্নির আত্মহত্যার খবর পেয়ে ফাঁস দিয়ে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলো প্রেমিক মিনারুল। মিনারুলের সাথে দেখা করার শাসন হিসেবে বুধবার সন্ধ্যায় মায়ের বকা খায় তাসমিয়া আক্তার মুন্নি। এরই জেরে রাত ১টার দিকে মুন্নি বিষপানে আত্মহত্যা করে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় এ খবর প্রচার হলে রাত ২টার দিকে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে প্রেমিক মিনারুল ইসলাম। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড়া সৃষ্টি হয়। মুন্নি গাংনী উপজেলার বালিয়াঘাট গ্রামের কৃষক মুন্তাজ আলীর মেয়ে এবং মিনারুল ইসলাম একই গ্রামের হাবুজেল আলীর ছেলে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মুন্নির পরিবারের লোকজন তার পড়ার টেবিলে একটি ডায়েরি খুঁজে পান। ডায়েরিতে প্রেম সম্পর্কে উপরোক্ত কিছু উক্তি চোখে পড়ে। ডায়েরি বুকে নিয়ে পরিবারের লোকজন শুধুই চোখের পানি ফেলেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে মুন্নি ও মিনারুলের মাঝে প্রেম সম্পর্ক চলছিলো। প্রেম মানে না কোনো বাধা কিংবা কোনো বারণ। আর তাইতো বুধবার দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে লোকলজ্জা উপেক্ষা করে দুজনে একই গ্রামের সাদিমানের বাড়ির পাশে দেখা করতে যায়। দুজনের একত্রে দেখে দু পরিবারকে জানিয়ে দেয় সাদিমানের স্ত্রী। এ নিয়ে গ্রামের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য বানে উভয় পরিবারকে জর্জরিত করতে থাকে। কুৎসা রটাতে থাকেন বাকা চোখের সমালোচকরা। এতে রাগে-ক্ষোভে সন্ধ্যায় মুন্নিকে কয়েকটি চড়থাপ্পড় মারেন তার মা। অভিমানী কিশোরী মুন্নি নিজ বাড়িতে রাতেই বিষপান করে। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বামন্দীর একটি ক্লিনিকে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে মুন্নির বিষপানের খবর পেয়ে ছটফট করছিলো তার প্রেমিক মিনারুল ইসলাম। কিছুতেই সে সহ্য করতে পারছিলো না। রাত জেগে মুন্নির চিকিৎসার খবর নিয়ে অবশেষে আসে মুন্নির না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার খবর। বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি মিনারুল। যে প্রেমিকা তার সাথে দেখা করতে এসে চলে গেছে পরপারে সেই প্রেমিকার দেখানো পথই অনুসরণ করে মিনারুল। প্রেমের দাম দিতে নিজেকে বলি দেয়ার সিদ্ধান্ত যেন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো? বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন মিনারুল তার নিজ ঘরের আড়ায় মাফলার জড়িয়ে চলে যায় না ফেরার দেশে। ভোরের দিকে পরিবারের লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে তার মরদেহ আড়া থেকে নিচে নামানো হয়।

এদিকে রাতেই মুন্নির লাশ বাড়িতে আনা হয়। সকালে মিনারুল ও মুন্নির আত্মহননের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে এলাকার মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রেমিক প্রেমিকার একসাথে গল্প করার বিষয়টি নিয়ে যারা বাকা সমালোচনা করেছিলেন তারা একই হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

এদিকে নিহতদের পরিবারে বইছে শোকের মাতম। রাগের বশে মেয়েকে শাসন করতে গিয়ে এখন অনুশোচনায় ভুগছেন মুন্নির মা। শোকের সাথে তার সেই অনুশোচনা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রেম যে কতো গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলো তা ভেবে অস্থির উভয় পরিবারের সদস্যরা।

তবে কিশোর বয়সে প্রেমের জন্য আত্মহননের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে সচেতন মহল। টিনেজারদের প্রতি তাই বাড়তি সকর্ত রাখার জন্য পরিবারকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন কয়েকজন চিকিৎসক। পরিবার কিংবা প্রতিবেশীর ভুল সিদ্ধান্তে আর কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা জুটির ভাগ্যে এমন দুর্দশা না জোটে সে বিষয়ে সবাইকে সহিষ্ণু হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষক।

এদিকে সকালে নিহত প্রেমিক প্রেমিকার মরদেহ ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেয় পুলিশ। গাংনী থানায় পৃথক দুটি অপমৃত্যু মামলা (ইউডি) দায়ের করে পুলিশ। কিন্তু পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি সাপেক্ষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন করা হয়।

বিকেল ৫টার দিকে গ্রাম্য করবস্থানে পর পর দুটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের হাজারো মুসল্লি জানাজা নামাজে অংশগ্রহণ করেন। পরে গ্রাম্য কবরস্থানে পাশাপাশি স্থানে দুজনের দাফন করা হয়।

মুন্নির সেই ভালোবাসা চিহ্নিত খচিত ডায়েরির আরেক পাতায় লেখা রয়েছে- ‘মরণ যদি হয় ভালোবেসে, তবুও রইবো আমি তোমারই পাশে। দেখবো আমি তোমাকে পাথর চোখে’। গ্রামবাসী হয়তো মুন্নির ডায়েরির ভাষা বুঝতে পেরেছেন। আর তাইতো দুজনকে পাশাপাশি কবর দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গ্রামের অনেকেই।

 

[ads1]

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *