চাঁদার লেইগ্যা আমার জামাইয়ের গায়ে আগুন দিছে দাবি স্ত্রীর : চার পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার : পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি

চাঁদার লেইগ্যা আমার জামাইয়ের গায়ে আগুন দিছে দাবি স্ত্রীর : চার পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার : পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি
স্টাফ রিপোর্টার: দোকানের পাশে রাস্তার ওপর তখনও পড়ে ছিলো নীল জ্যাকেটের না পোড়া সামান্য অংশ। তা কুড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করছিলেন লাকী বেগম। ‘এই জ্যাকেট আমার জামাইর (স্বামী) গায়ে ছিলো। পুইড়া টুকরা হইয়া পইড়া আছে। পুলিশের সামনে আমার জামাইর গায়ে আগুন দিল সোর্স দেলোয়ার। আমি তাগো বিচার চাই।’ রাজধানীর শাহআলী থানার গুদারাঘাট এলাকায় গিয়ে বৃহস্পতিবার দেখা গেছে এ দৃশ্য। লাকী চা দোকানদার বাবুল মাতবরের স্ত্রী। চাঁদা না দেয়ায় গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় পুলিশের উপস্থিতিতে বাবুলের গায়ে আগুন দেয়া হয়। ১৬ ঘণ্টা লড়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান তিনি।
এ ঘটনায় শাহআলী থানার চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে মিরপুর ডিসি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- এসআই মোমিনুর রহমান খান, নিয়াজ উদ্দিন মোল্লা, এএসআই দেবেন্দ্র নাথ ও কনস্টেবল জসিম উদ্দিন। ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ডিএমপির মিরপুর বিভাগ। বাবুলের মেয়ে রোকসানা আকতার বুধবার রাতেই থানায় মামলা করেছেন। তবে এজাহারে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। পরিবার বলছে, অভিযোগ শুনলেও পুলিশ তাদের মতো করে এজাহার লিখে স্বাক্ষর নিয়েছে। এ নিয়েও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বাবুলকে হারিয়ে তার পরিবারে এখন শুধুই কান্না আর আহাজারি। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, রাত সাড়ে ৯টার দিকে সোর্স দেলোয়ারকে সাথে নিয়ে বাবুল মাতবরের কাছে চাঁদা চায় পুলিশ। টাকা না দেয়ায় পুলিশের সামনেই দেলোয়ার বাবুলকে স্টোভের (কেরোসিনের চুলা) ওপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সাথে সাথেই বাবুলের পুরো শরীরে আগুন ধরে যায়। এ সময় মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকলেও পুলিশ সদস্যরা বা অন্য কেউ আগুন নেভাতে এগিয়ে আসেনি। বাবুলের ছেলে রাজু মাতবর বলেন, মৃত্যুর আগে আমার বাবা বলেছেন, এক দারোগা তার হাতে আঘাত করেছে। এক কনস্টেবল দোকান ভেঙে দিয়েছে। সোর্স দেলোয়ার হাত ধরে টান দিয়ে বাবাকে চুলার ওপর ফেলে দেয়। বাবুল মাতবরের গ্রামের বাড়ি ভোলা মুন্সিরচর এলাকায়। ৩৫ বছর ধরে মিরপুর ১ নাম্বার গুদারাঘাটের ৬নং রোডের ৯ নম্বর বাসায় থাকেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেয়া হয়নি: রোকসানা আকতার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও পুলিশের সোর্স দেলোয়ারের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান। কিন্তু পুলিশ ৬ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে আসামি করে এজাহার লেখে। এতে কোনো পুলিশ সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বাবুলের আরেক মেয়ে মনি আক্তার অভিযোগ করেন, আমরা যেভাবে এজাহার লিখতে চেয়েছিলাম, পুলিশ তা লেখেনি। পুলিশ নিজের মতো করে এজাহার লিখে জোর করে সই নিয়েছে। এ কারণে এজাহারে পুলিশের চাঁদা চাওয়া ও উপস্থিতির কথা উল্লেখ নেই। বাবুলের ছেলে রাজু বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে থানা থেকে বলা হয়, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেয়া হবে না। মামলা করতে হলে মাদক ব্যবসায়ী পারুল ও শংকরের নামে মামলা কর। পুলিশ আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের মতো করে মামলা (এজাহার) লিখেছে। আমরা এ মামলা মানি না। আমরা প্রয়োজনে আদালতে আবার মামলা করব।
এ বিষয়ে শাহআলী থানার ওসি একেএম শাহীন মণ্ডল বলেন, বাদী যেভাবে এজাহার লিখেছে সেভাবে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। কারও নাম বাদ দিতে বা নাম সংযুক্ত করতে তাদের চাপ দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, পুলিশই হোক আর সাধারণ পাবলিকই হোক ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পারুল নামে একজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তদন্ত কমিটি: ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ডিএমপি সদর দফতরের ডিসি (ডিসিপ্লিন) টুটুল চক্রবর্তীকে প্রধান করে একটি কমিটি এবং মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মাসুদ আহাম্মদ ও মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহাবুব হোসেনের সমন্বয়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত আছে কি-না, ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলো কি-না, এসব ব্যাপারে জানতে পুলিশের পক্ষ থেকে এ কমিটি গঠন করা হয়। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার কাইয়ুমুজ্জামন খান বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ সদস্য জড়িত ছিলো কি-না তা তদন্ত করে জানা যাবে।
নিয়মিত চাঁদা নেয় পুলিশ: গুদারাঘাটের বটতলা থেকে বেড়িবাঁধের দিকে যেতে কিংশু সিটির গেটের বামপাশে রাস্তার ওপর টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘেরা চা দোকান। প্লাস্টিকের বস্তা কেটে ছাউনি দেয়া। এ দোকানটিই বাবুল মাতবরের। বৃহস্পতিবার সেখানে স্থানীয়রা জানান, রাস্তার পাশে ও ফুটপাতের ওপরের টং দোকানগুলো থেকে শাহআলী থানা পুলিশ নিয়মিত চাঁদা তোলে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর এবং দোকান তুলে দেয়া হয়। ভুক্তভোগীরা বলেন, পুলিশকে চাঁদার টাকা দিয়েই রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে দোকান বসাতে পারেন তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সোর্স দেলোয়ারকে সাথে নিয়ে পুলিশের একটি টিম বাবুল মাতবরের কাছে চাঁদার টাকা আনতে যায়। রাস্তার ওপর পুলিশ গাড়ি পার্কিং করে গাড়ি থেকে নেমে দোকানের সামনে যায়। পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে আর দেলোয়ার টাকা চান বাবুলের কাছে।
হৃদয়বিদারক দৃশ্য: ঘটনাস্থল, বাবুলের বাড়ি ও ঢামেক হাসপাতাল- ৩ স্থানের বাতাসই বৃহস্পতিবার ভারি হয়েছে স্বজনদের কান্নায়। পরিস্থিতি দেখে চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি অনেকেই।
স্বামীর চা দোকানের পাশে বসে লাকী বেগম বলেন, ‘তারা আমার স্বামীর কাছে টাকা চায়। আমার স্বামী প্রতিবাদ করছে, বলছে আমি কর্ম করে ভাত খাই। আপনাগোর টেকা দিমু কির ল্যাগা? টেকা দিমু না। এরপর আমার স্বামীরে থানায় যেতে কয়। ব্যাটারা লাঠি দিয়া বারি দেয় চুলার ওপর। পুলিশ পাশে দাঁড়াইয়া ছিলো। দেলোয়ার আবার গুতা দিল আমার স্বামীরে। এরপর দেলোয়ার আমার স্বামীরে ধাক্কা দিয়ে চুলার ওপরে ফালাইয়া দিছে। চুলার ওপরে পড়ে আমার স্বামীর গায়ে আগুন ধইরা যায়। লাকী বেগমের অভিযোগ, তার স্বামীর শরীরে আগুন নেভাতে পুলিশ কোনো সহায়তা করেনি। বাবুল মাটিতে গড়াগড়ি দেয়। একপর্যায়ে বাবুল উঠে পুলিশের দিকে ছুটে যায়। সে সময় পুলিশ সেখান থেকে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া হীরা বলেন, ‘চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি, বাবুলের শরীরে আগুন জ্বলছে। বাবুল রাস্তার ওপর শুইয়া রইছে। পোশাক পরা পুলিশ তার সামনে দাঁড়াইয়া। যখন আগুন নিভছে তখন বাবুল উইঠা পুলিশকে ধাওয়া দেয়। পুলিশ বেড়িবাঁধের দিকে পালাইয়া যায়। আনুমানিক ২০ গজ দূরের মিলন নামে চা দোকানি বলেন, ‘আমি ঘটনার সময় পুর্লিশের গাড়ি দাঁড়াইয়া থাকতে দেখেছি।’ ঘটনাস্থলের পাশে পিঠা দোকানি বৃদ্ধা জুলেখা বলেন, ‘হাওখাও হুইন্যা আমি উঁকি দিয়া দেখি, বাবুলের শরীরে আগুন জ্বলতাছে। বাবুল গড়াইতেছে। বাবুলের ছোট মেয়ে লাবনী আক্তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বাবাকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে সে। কোনো সান্ত্বনায় তাকে মানানো যাচ্ছিল না। বারবার বলছিলো, যে পুলিশ মানুষের প্রাণ বাঁচাবে সেই পুলিশই তার বাবার প্রাণ কেড়ে নিল। পুলিশ কিভাবে এমন হিংস্র হয়, এমন বর্বর হয়।
স্বজনরা যখন হাসপাতালের বারান্দায় আর্তনাদ করছিলেন তখন বাবুলের ৪ বছরের ছোট্ট ছেলে জুনায়েদ হোসেন সাজু দেয়ালের পাশে মুখ লুকাচ্ছিল। চারদিকে আর্তচিৎকার আর মিডিয়ার লোকজনের ভয়ে শিশু সাজু দেয়ালের দিকে মুখ রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বলছিল। কাছে যেতেই ছোট সাজু বলল, ‘আব্বারে লইয়া যামু, আপু ভাইয়েরা আইছে, সবাই বাসায় যামু। বলতেই কান্না শুরু করে শিশু সাজু। ছেলের সংসারেই ছিলেন বাবুল মাতবরের বৃদ্ধ মা রৌশনারা বেগম। ঢামেক হাসপাতালে ছেলের লাশের ওপর আছড়ে পড়ে বলছিলেন, এখন আমার কী হইব। সামান্য অসুখ হইলে ছেলে ব্যাকুল হইত। সেই ছেলে এখন অঙ্গার হয়ে আছে। ছেলেকে জ্বালিয়ে মাইরে ফেলেছে পুলিশ। তিনি বলেন, যেসব পুলিশ তার ছেলের ওপর এমন বর্বরতা চালায় তাদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘পুলিশের কি মা বাবা ভাই বোন নেই। তারা কি করে ছেলেকে আগুন দিয়ে পুড়ে দিল।’ রৌশনারা বলেন, এখন সংসারটির কি হবে, কে এ সংসার চালাবে।
ঘটনার পরপরই স্বজনরা দগ্ধ বাবুলকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরের ৯৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। পোড়েনি শুধু পায়ের পাতা। সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল তার শ্বাস ও কণ্ঠনালি। তাকে এইচডিইউতে রাখা হয়। শত চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
চাঁদার জন্যই পুলিশ আগুন দিয়েছে: বৃহস্পতিবার ঢামেক হাসপাতালে বাবার লাশের পাশে বসে রাজু জানান, মৃত্যুর আগে বাবা পুলিশ কমিশনারের কাছে স্পষ্ট করে বলেছেন, পুলিশ সদস্যরা তার কাছে চাঁদা না পেয়ে মারধর করেছেন। একপর্যায়ে তাকে চুলার ওপর ফেলে দেন। গায়ে আগুন লেগে গেলে প্রাণ বাঁচাতে বাবা চিৎকার করলেও পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসেননি। বাবুলের মেজ মেয়ে মনি আক্তার বলেন, পুলিশ ওই এলাকায় মাদক বিক্রেতা, অপরাধী থেকে শুরু করে সবার কাছ থেকে চাঁদা তোলে। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী পারুল ও তার স্বামী আজিজুল ইসলাম ২ বছর আগে ৯০ কেজি গাঁজাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলো। তাদের গ্রেফতারে বাবার ভূমিকা রয়েছে বলে পারুলরা বলে থাকে। পারুলের সাধে থানার বর্তমান পুলিশ সদস্যদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশ পরিকল্পিতভাবেই বাবাকে আগুন দিয়ে পুড়ে মেরেছে।
নিন্দা: বাবুল মাতবরের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র নিন্দা প্রকাশ ও দোষীদের শাস্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেম ও সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশিদ এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দিন উমর ও সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এ দাবি জানান।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *