গোয়েন্দা সতর্কবার্তা : স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বাড়তি নজরদারির নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টসহ নানা অপকৌশলে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে দেশি-বিদেশি একাধিক শক্তিশালী চক্র মাঠে নেমেছে। তাদের নীল নকশা অনুযায়ী সন্ত্রাসীরা এরই মধ্যে মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় ঢুকে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মযাজকসহ প্রায় একডজন ধর্মীয় নেতার ওপর হামলা চালিয়েছে। আরো বেশকিছু ধর্মীয় উপাসনালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও তাদের টার্গেটে রয়েছে। ষড়যন্ত্রকারী এ চক্র আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের দিয়ে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে তা আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের ঘাড়ে চাপিয়ে দেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করছে। দায়িত্বশীল একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এসব তথ্য জানিয়ে সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, উদ্বেগজনক এসব তথ্য সংবলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে হামলার প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করে ষড়যন্ত্রকারী চক্রকে চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি ৱ্যাব ও পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর নেপথ্যের দেশি-বিদেশি ইন্ধনদাতা ও অর্থদাতাদেরও খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছে সরকার। একই সাথে এসব নাশকতা ও হত্যা প্রচেষ্টার মিশন পরিচালনাকারী সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশেষ ছক তৈরি করছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই দেশজুড়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু হচ্ছে।
সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধারণা, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে ইতোমধ্যে সংঘটিত হামলা-নাশকতার ঘটনা স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনায় ঘটেনি। দীর্ঘসময় ধরে এ নীল নকশা তৈরি করা হয়েছে। নাশকতার ফ্রন্ট লাইনে উগ্র মৌলবাদী সংগঠনের নেতাকর্মী থাকলেও এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক একাধিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ইন্ধন জুগিয়েছে। দেশের বিভিন্ন পরাজিত শক্তি স্থানীয়ভাবে তাদের সহায়তা দিয়েছে বলে মনে করেন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, ধর্মীয় উপাসনালয় ও ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলার রহস্য উদ্ঘাটনের চেয়ে এ ষড়যন্ত্রের হোতাদের চিহ্নিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যাতে দ্রুত ষড়যন্ত্রকারীদের মূলোৎপাটন করা যায়। ছাই চাপা দিয়ে আগুন দীর্ঘদিন নিভিয়ে রাখা যাবে না। বাতাস পেলেই তা আবারো ভয়ঙ্করভাবে জ্বলে উঠবে এমন আশঙ্কা বিবেচনায় রেখেই এ ব্যাপারে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ গোয়েন্দারা।
এদিকে এসব নাশকতা ও হামলার ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে এ নীলনকশার ছক খুঁজে বের করে অদূর ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই এ ধরনের ঘটনার পুনারাবৃত্তি না ঘটে এজন্য মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদন্ত করে স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম সতর্কতার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া গোয়েন্দারা কেন এসব হামলার ব্যাপারে আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে তারও জবাব চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে এসব হামলা ও নাশকতার ঘটনার প্রতিবাদ করার নামে যাতে কোনো ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি সাম্প্রদায়িক শান্তি বিনষ্ট করতে না পারে সে ব্যাপারেও গোয়েন্দাদের আগাম তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আগেভাগেই তাদের নিষ্ক্রিয় রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হবে। গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির এডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ভিত্তিক হামলা একই গোষ্ঠীর হাতে ঘটার বেশকিছু তথ্যপ্রমাণ এরই মধ্যে তাদের হাতে এসেছে। এসব তথ্য আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দিনাজপুরে মন্দিরে হামলা এবং ইতালীয় ধর্মযাজককে গুলির ঘটনায় গ্রেফতারকৃত জেএমবি সদস্য শরিফুল ইসলাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার মধ্যদিয়ে ধর্মীয় সব হামলার ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে দাবি করেন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, কাহারোল উপজেলায় আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভবনামৃত সংঘের (ইসকন) মন্দিরে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া শরিফুল ইসলাম ১৭ ডিসেম্বর দিনাজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এ সময় তিনি বলেন, ইসকন মন্দিরে হামলা এবং ধর্মযাজক পিয়েরো পিচমকে গুলির ঘটনা জেএমবি ঘটিয়েছে।
গোয়েন্দাদের ধারণা, শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়, বগুড়ায় শিয়া মসজিদে ঢুকে মুয়াজ্জিনকে গুলি করে হত্যা, ফরিদপুরে ঐক্যপরিষদ নেতা অলোক সেনের ওপর চাপাতি আক্রমণ, মুন্সীগঞ্জে মন্দিরে পাঁচ প্রতিমা ভাঙচুরসহ ধর্মীয় সব হামলার ঘটনার নেপথ্যে যোগসূত্র রয়েছে। এসব ঘটনা জেএমবি কিংবা আইএস বা অন্য যে-ই ঘটানোর দাবি করুক না কেন, এর সময়কাল, পারিপার্শ্বকতা ও ধরন দেখে তা অভিন্ন টার্গেটে সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে এসেছে। পুলিশ সদর দফতরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, মৌলবাদী জঙ্গি কিংবা ষড়যন্ত্রকারী চক্র ধর্মীয় উপাসনালয়ে যাতে আকস্মিক হামলা চালাতে না পারে এজন্য মসজিদ-মাদরাসা, মাজার এবং গীর্জা ও মন্দিরসহ সব ধরনের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর (কেপিআই) নিরাপত্তা কয়েক ধাপ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন ও সতর্ক করারও তাগিদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে শুধু দেশীয় চক্র নয় বরং বিদেশিদেরও একটি চক্র উঠে-পড়ে লেগেছে। তবে নানা সীমাবদ্ধতার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, হোসেনি দালানে বোমা হামলা, আশুলিয়া ও গাবতলীতে পুলিশ হত্যা, রংপুর ও গুলশানে বিদেশি হত্যা, বিভিন্ন উপাসনালয়ে হামলা সবগুলোই একসূত্রে গাঁথা। অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই এসব অপতৎপরতা চালানো হয়েছে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু হলেও ধর্মান্ধ নয়। তাই ইসলামের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চোরাগোপ্তা নাশকতা ঘটিয়ে জেএমবি, আল-কায়দা কিংবা আনসারুল্লাহ বাংলাটিম যারাই দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার পরিকল্পনা করুক না কেন জনগণ তা পণ্ড করে দেবে। জঙ্গিদের আত্মঘাতী চেষ্টা চালালেও কোনো লাভ হবে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *