বাংলার মাটিতে নির্বাচন বানচাল করার ক্ষমতা কারো নেই

নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিতে প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করে সংসদে সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিতে প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। বাংলার মাটিতে সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবেই। নির্বাচন বানচাল করার ক্ষমতা কারো থাকবে না এবং নেই। আমরা গণতান্ত্রিক যে যাত্রা শুরু করেছি, আমি আশা করছি আগামী নির্বাচনের পরে এ যাত্রা আরো মজবুত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেছি। তিনি আমাকে নির্বাচন পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করার জন্য অনুমতি দিয়েছেন। গতকাল বুধবার রাতে চলতি নবম জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে বলেন, ১৯তম অধিবেশন সমাপ্ত করার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির চিঠি পাওয়া গেছে। এ চিঠি পড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা সমাপনী বক্তব্য রাখবেন। এরপর শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, আমি রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেছি। আমি স্পষ্টভাষায় বলতে চাই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার কোনো মৌলিক ও নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেবে না। নির্বাচনকালে নির্বাচন কমিশনের হাতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো থাকবে। সরকার শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনায় তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিবে। তাছাড়া সরকার দৈনন্দিন কাজ করবে। এর বাইরে সরকার কিছুই করবে না।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও শক্তিশালী। নির্বাচন কমিশনকে আর্থিকভাবে স্ব্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। ছবিসহ ভোটার তালিকা ও স্ব্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে নির্বাচন হবে। এখন আর ভোট চুরির কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া ভোট চুরি করে ক্ষমতায় আসার নিয়তও আমাদের সরকারের নেই। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো আওয়ামী লীগের ছিলো না। ভবিষ্যতেও থাকবে না।

বিরোধীদলীয় নেত্রীকে টেলিফোন করা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আমি উপযাচক হয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে টেলিফোন করেছিলাম। দুপুর একটা থেকে চেষ্টা করেও আমি কথা বলতে পারিনি। আমার স্টাফরা জানালো রাত ৯টার আগে বিরোধী দলীয় নেতা টেলিফোন ধরার জন্য প্রস্তুত হতে পারবেন না। তিনি বলেন, আমি সন্ধ্যায় টেলিফোন করে বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে কথা বলি। নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে আলাপ করার জন্য গণভবনে দাওয়াত দিই। তিনি ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করে নিজে দু দিন সময় দিয়েছিলেন। আমি এক দিনের মধ্যে টেলিফোন করেছি। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেতা নিজের কথা নিজেই রাখেননি। তিনি হরতাল প্রত্যাহার করলেন না। আমি ধৈর্য ধারণ করেছিলাম। পরদিন জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা ছিলো। পরীক্ষার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে হরতাল না দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি পরীক্ষার দিকটি চিন্তা করলেন না। হরতাল দিলেন, মানুষ পুড়িয়ে মারলেন। কিন্তু তিনি এসব করে কি পেলেন সে প্রশ্ন আমি জাতির কাছে রাখতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী ৪১৮ দিনের মধ্যে মাত্র ১০ দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। আবার তিনি ছয় দিনে সাত ঘণ্টা ১১ মিনিট বক্তব্য রেখেছেন। সংসদে উপস্থিত না থাকলেও সময় নিয়ে ঠিকই বক্তব্য রেখেছেন। তিনি যদি ৪১৮ দিনের মধ্যে সংসদে বেশি সময় উপস্থিত থাকতেন তাহলে আমি নিজে খুশী হতাম। তিনি আরো বলেন, আমি রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছি নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। নির্বাচন কমিশন তারিখ ঘোষণা করবে। বাংলার মাটিতে নির্বাচন অবশ্যই হবে। সে নির্বাচন বানচাল করার ক্ষমতা কারো নেই এবং থাকবে না। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের সরকারের সময় পাঁচ হাজার ৮২৮টি নির্বাচন হয়েছে। বিরোধী দল একটি নির্বাচন নিয়েও কোনো অভিযোগ করতে পারেনি। সকল নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হয়েছে। তার একমাত্র উদাহরণ যে বিরোধী দলের মেয়র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। এসব নির্বাচনে ৬৪ হাজার ৬০ জন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। আমার খুবই দুঃখ লাগে যখন দেখি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী বিরোধী দলীয় মেয়র প্রার্থীদের পাশে বসিয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। এটা আসলেই হাস্যকর।

প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমি তাদেরকে বলবো আসুন নির্বাচন করুন। নির্বাচন করবে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। জনগণ যাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে তারাই সরকার গঠন করবে। বিরোধীদলীয় নেতার যদি আত্মবিশ্বাস থাকে যে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হবেন, আমি মনে করি তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কারণ আমাদের হাত দিয়ে নির্বাচনে কোনো কারচুপি হতে পারে না। আর এর প্রমাণ তো বিরোধীদল ও দেশবাসী দেখেছে। আমাদের সময় নির্বাচনে তাদের মেয়র প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। আমরা চাই জনগণের ভোটের অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার যেন নিশ্চিত থাকে। জনগণ যেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে-সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমি দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানাই তারা যেন আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করেন। জনগণের ক্ষমতা যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে সে জন্য নির্বাচনে উত্সাহ নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রীপরিষদ এবং মন্ত্রীদের দপ্তর বন্টনের গেজেট প্রকাশ করা হবে। তিনি আরো বলেন, দেশে কোনো যুদ্ধাবস্থা না হলে এটি হচ্ছে চলতি নবম সংসদের শেষ অধিবেশন। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যাদেরকে নির্বাচিত করবে তারাই সরকার গঠন করে সংসদে এসে বক্তব্য রাখবেন। বিরোধীদলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। দেশবাসী স্বতস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে অসাংবিধানিকভাবে আর কেউ যাতে ক্ষমতা নিতে না পারে এবং জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে তা নিশ্চিত হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। সাংবিধানিক ধারা থাকবে অব্যাহত। এটি দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল। আমরা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করি। আমরা ছাড়া আর কেউ শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। বর্তমান বিরোধীদল যখন ক্ষমতায় ছিল তখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। এটা ছিলো জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *