৭ হাড়ি সোনার মোহরের লোভে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা গচ্চা : ধরা পড়েছে জিনের বাদশা

মোবাইলফোনে প্রতারণার টোপ ঘরে আসছে লক্ষ্মী : রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে দামুড়হুদা মদনার পিতা-পুত্র

হারুন রাজু/হানিফ মণ্ডল: রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে গেলো দামুড়হুদা মদনার পিতা-পুত্রের। ৭ হাড়ি সোনার মোহর পাওয়ার লোভে কথিত জিনের বাদশার হাতে সাড়ে তিন লাখ টাকা তুলে দিয়ে এখন হায় হায় করছেন। এ টাকা লোভী পিতা-পুত্র তাদের জমি-জমা সোনার গয়না, গরু, ছাগলসহ ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করে প্রতারক জিনের বাদশার হাতে তুলে দেয়। অবশেষে কুষ্টিয়া গোয়েন্দা পুলিশ অভিনব কৌশল অবলম্বন করে আটক করেছে কথিত জিনের বাদশা প্রতারক আজাদকে। তাকে আটকের পর থেকেই চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। কুষ্টিয়া মডেল থানায় আজাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন মদনার মহিমউদ্দিন।

জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের মদনা স্কুলপাড়ার এতবারি মণ্ডলের ছেলে মহিম উদ্দিন একজন কৃষক। গত বছরের ৫ জানুয়ারি রাত ৩টার দিকে মহিমের ব্যবহৃত মোবাইলফোনে ০১৯৬৫-১৪০২১৭ নম্বর থেকে ফোন আসে। অজ্ঞাত স্থান থেকে বলা হয় আমি ৪র্থ আসমান থেকে জিনের বাদশা বলছি। তোমার ঘরে লক্ষ্মী আসছে, তুমি তাকে গ্রহণের প্রস্তুতি নাও। তোমাকে এ লক্ষ্মী পেতে হলে তিনটি খাসি ছাগল, ৫১ কেজি আতপ চাল অথবা সমপরিমাণ ২১ হাজার ১ টাকা জোগাড় করতে হবে। এ টাকা কুষ্টিয়া পৌরসভার পেছনে পুকুর ঘাটের বটগাছের নিচে রেখে আসতে হবে। টাকা না দিলে তোমার তিন ছেলে ও এক মেয়ে মারা যাবে। কথাগুলো কাউকে বললে তোমার বড় ধরনের ক্ষতি হবে। একদিকে ঘরে আসছে লক্ষ্মী, অপরদিকে ক্ষতির ভয়। মহিমের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, মহিম উদ্দিন সন্তানদের ক্ষতির কথা ভেবেই ৪ দিনের মাথায় ৯ জানুয়ারি কথামতো ওই পরিমাণ টাকা যথাস্থানে পৌছে দেয়। টাকা দেয়ার সময় পলিথিনের প্যাকেটে একটি শিশার মূর্তি পায় মহিম উদ্দিন। কয়েকদিনের মাথায় কথিত ওই জিনের বাদশা মহিমকে মোবাইলফোনে বলে, তোমার প্রতি আমরা খুশি হয়েছি। তাই তোমাকে ধনী বানাতে ৭ হাড়ি সোনার মোহর দেয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ মোহর নেয়ার জন্য তোমাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য তোমাকে জিনদের খুশি করতে দু লাখ ৬০ হাজার ৭৬০ টাকা দিতে হবে। এ টাকা পরিশোধ করলেই তুমি পেয়ে যাবে ৭ হাড়ি সোনার মোহর। রাতারাতি বনে যাবে এলাকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর দরিদ্র কৃষক মহিম উদ্দিন ১৪ কাঠা মাঠাল জমি, গরু-ছাগল, স্ত্রী-কন্যার সোনার গয়নাসহ আসবাবপত্র বিক্রি করে গত বছরে ১৬ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে কথিত জিনের বাদশার কথামতো একই স্থানে ওই টাকা রেখে আসেন। একদিনের মাথায় মহিমের কাছে ফের কল করে কথিত জিনের বাদশা। মহিমকে বলা হয় সোনার মোহর ভর্তি ৭টি হাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন আরো ৪৩ হাজার ৩ টাকা এবং মহিমের ব্যবহৃত সিমকার্ডটিও রেখে জিনের বাদশার দেয়া একটি সিমকার্ড নিয়ে আসতে বলা হয়। যেমন কথা তেমন কাজ। মহিম ধনীর হওয়ার জন্যই ফের ওই পরিমাণ টাকা জুগিয়ে ওই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে চিপসের প্যাকেটে ভরে টাকা রেখে আসেন এবং নিজের সিমকার্ড রেখে নিয়ে আসেন ওই সিমকার্ডটি। এরপর থেকেই কথিত জিনের বাদশা তার ব্যবহৃত ফোন বন্ধ রাখে। সে থেকেই সব হারানোর জ্বালায় জ্বলতে থাকে মহিম ও তার পরিবারের সদস্যরা। টানা এক বছর পেরিয়ে যায়। প্রতিদিনই কথিত জিনের বাদশার মোবাইলফোনে কল করে দেখা যায় বন্ধ। হঠাত করেই চলতি বছরের শুরুতেই কথিত জিনের বাদশার ব্যবহৃত সেই নম্বরটি খোলা পায় মহিমের ছেলে আক্তারুল। আক্তারুল তার পরিচয় গোপন রেখে নিয়মিত যোগাযোগ করে কথিত জিনের বাদশার সাথে। কথিত জিনের বাদশা একইভাবে প্রতারণার ফাঁদ পাতে আক্তারুলের কাছে। কৌশলে এগোতে থাকে আক্তারুল। মাঝে মধ্যে মোবাইলফোনে শুধুমাত্র ফ্লেক্সিলোডের মাধ্যমে অল্প-সল্প টাকা দেয় আক্তারুল। জিনের বাদশার কাছে সরলতার ভনিতায় কথা বলতে থাকে। এ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে জিনের বাদশা। তার পিতার মতো আক্তারুলকে একইভাবে ২১ হাজার ১ টাকা রেখে আসতে বলে ঢাকার একটি স্থানে। এ সময় আক্তারুল জানিয়ে দেয় সে ঢাকা চেনে না। এছাড়া কোনো দিন সে ঢাকায় যায়নি। এ কথা শুনে কথিত জিনের বাদশা কুষ্টিয়া ছেউড়িয়া লালন শাহ মাজারে একটি স্থানে টাকা রেখে আসার প্রস্তাব দিলে সহজেই গ্রহণ করে আক্তারুল। স্থানীয় যুবকদের সাথে সলাপরামর্শ করে আক্তারুল যোগাযোগ করে কুষ্টিয়া গোয়েন্দা পুলিশের সাথে। গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় গতপরশু ১৭ এপ্রিল শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে আক্তারুল কুষ্টিয়া পৌঁছে কথিত জিনের বাদশার সাথে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করে। কথিত জিনের বাদশার কথামতো ওই টাকা মাজারের পাশে একটি বটগাছের তলায় টাকার পরিবর্তে মোবাইলফোনের একটি খালিবাক্স রেখে আসে আক্তারুল। এ সময় কথিত জিনের বাদশা টাকা নিতে আসতেই গোয়েন্দা পুলিশের পাতা জালে আটকে যায়। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের দুধিয়া গ্রামের রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে আজাদুল ইসলাম ওরফে আজাদকে (২৭) গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। গ্রেফতারের পর আজাদকে জিজ্ঞাসাবাদে সে প্রতারণার কথা অকপটে স্বীকার করে। আজাদের প্রতারণাচক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে পুলিশ নতুনভাবে জালবিস্তার করেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে গত শুক্রবার মহিমউদ্দিন বাদী হয়ে আজাদসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে ধনীর হওয়ার প্রলোভনে পরে সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে মহিম।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *