হরদম হরিলুটে আমদানিতে আগ্রহ হারাচ্ছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো

দর্শনা রেলইয়ার্ডে কোনভাবে ঠেকানো যাচ্ছে না লুটেরাদের : তাড়ানোর সরষেতেই ভ

 

হারুন রাজু/হানিফ মণ্ড: দর্শনা রেলইয়ার্ডে লুটেরাচক্রের অপতৎপরতা কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। পণ্যভর্তি ওয়াগন থেকে লাগাতার হরিলুট হচ্ছে। লুটপাটের মহোৎসবে মেতেছে লুটেরাচক্র। রেলওয়ে নিরাপত্তা সদস্যদের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে পুলিশ-বিজিবি টহল দিলেও ফলাফল শূন্যের কোটায়। হরদম হরিলুটের কারণে এ রুটে আমদানি করতে আগ্রহ হারাতে শুরু করেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। সুষ্ঠু পরিবেশে আমদানির জন্য তারা বেছে নিচ্ছে দেশের অন্যান্য রেলপথ ও সড়কপথ। সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। লুটেরাদের কারণেই দর্শনার ঐতিহ্য বিঘ্নিত ও চরম ক্ষতির দিকে ধাবিত হলেও যেন দেখার কেউ নেই অবস্থায় পরিণতি হয়েছে। নিরাপত্তা কর্তা ও সদস্যদের ম্যানেজ করেই লুটপাটের উঠেছে অভিযোগ। শুরুতে দর্শনা রেলইয়ার্ডে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রচুর পরিমাণে মালামাল রাখা হতো। ইয়ার্ডে সে সময় ছোটখাটো চুরির ঘটনা ঘটলেও বর্তমান অবস্থার মতো লুটেরাদের ওয়াগন লুটের অভিযোগ ছিলো না। সে সময় ইয়ার্ডের সুনামের কারণেই এ রুটে আমদানিতে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হয় দেশের বিভিন্ন জেলার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। বছর কয়েক আগে লুটেরাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় দর্শনা রেলইয়ার্ড। এতে এ রুটে আমদানি কমিয়ে দেন আমদানিকারকরা। বছরখানেক আগে সরকারের বিশেষ সুবিধা ও নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ফের জোরেশোরে আমদানি শুরু হয় দর্শনা রেলইয়ার্ড বন্দরে। সম্প্রতি শুরুর দিকে নিরাপত্তা বিভাগ নবসাজে সজ্জিত হয়ে লোক দেখানো দায়িত্ব পালন করলেও সপ্তাখানেকের মাথায় পাল্টে যায় তাদের চেহারা। আগের অবস্থায় ফিরে যান রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগের দর্শনায় দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও সদস্যরা। আগের মতো লুটেরাদের সাথে অর্থের বিনিময় অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে বলে উঠেছে অভিযোগ। এখন সময় বিক্রির চুক্তিতে রেলইয়ার্ডে হচ্ছে লুটপাট। নিরাপত্তাকর্মীদের পকেট ভরছে লুটেরাদের মালামাল ভর্তি প্যাকেট চুরির টাকায়। শুধু রাতের আঁধারেই সীমাবন্ধ নেই লুটেরাচক্র। দর্শনা রেলইয়ার্ডে রাত-দিন অবিরাম ঘটছে লুটপাটের ঘটনা।

অভিযোগ উঠেছে, দেশের বিভিন্ন জেলার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে আমদানি করে থাকে সয়াবিন, ভূষি, ভুট্টা, গম ইত্যাদি মালামাল। ভারত থেকে আমদানিকৃত মালামাল ভর্তি ৪০ থেকে ৪২ ওয়াগন বিশিষ্ট একটি ৱ্যাক দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলইয়ার্ডে রাখা হয় কাস্টমসসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্যে। কাস্টমস ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে অনেকটা সময় প্রয়োজন। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দর্শনার কোনো না কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এ কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে। যার কারণে প্রতিদিনই মালামাল ভর্তি ৩/৪টি ৱ্যাক রাখা হয় দর্শনা রেলইয়ার্ডে। রক্ষণের নামে ভক্ষণে মেতে ওঠে নিরাপত্তা সদস্য থেকে শুরু করে লুটেরাচক্র। ছাড়পত্রের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগে নিরাপত্তা সদস্য ও পিটিএল বাহিনীর সাথে চুক্তিমাফিক লুটপাট শুরু করে তারা। এলাকার কমপক্ষে ১০টি লুটেরাচক্রসহ শতাধিক লুটেরার ছোবল পড়ে মালবাহী ওয়াগনগুলোতে। এতে একটি ৱ্যাক থেকে ৫০ থেকে ৬০ টন মালামাল লুটের ঘটনা ঘটে। ফলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে লোকসান গুনতে হয়। ইয়ার্ডের সয়াবিন, ভূষির ৱ্যাক প্রবেশ করলে লুটেরাদের মহোৎসব শুরু হয়।

সূত্র বলেছে, একটি সয়াবিন ৱ্যাক ইয়ার্ডে প্রবেশ করলে লুটেরাদের নগ্ন হামলায় লুটপাট হয় কমপক্ষে ৭০ মেট্টিক টন ভূষি। এতে ৬০/৬৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে। নিরাপত্তা, পিটিএল বাহিনী ও লুটেরাচক্রের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই ঘটে হামলা, পাল্টা হামলা ও মারধর ছাড়াও পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষণের ঘটনা। এতে হতাহতের ঘটনা অহরহ ঘটছে। ২/১ দিনের মধ্যে ফের যা তাতেই পরিণত হয়। লুটেরা ও নিরাপত্তাকর্মীদের সখ্য দেখে অনেকেই মন্তব্য করে বলে থাকে যেন চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। অভিযোগ উঠেছে, লুটেরাদের সাথে চরম সখ্যের মূল হোতা হিসেবে রয়েছেন দর্শনা রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগের ইনচার্জ তৌফিক ও এসআই হাসান। দর্শনা রেলইয়ার্ড থেকে লুটপাটকৃত মালামাল কিনে দর্শনার বেশ কয়েকজন ভূষিমালব্যবসায়ী রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। এ লুটপাট ঠেকাতে সম্প্রতি ইয়ার্ড এলাকায় টহল দিতে দেখা যায় বিজিবি ও পুলিশকে। এতেও হয়নি কোনো সুফল। কারণ হিসেবে জানা গেছে, ইয়ার্ডে লুটপাটের ঘটনা ঘটে থাকে নিরাপত্তা ও পিটিএল বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। যে কারণে ইয়ার্ডের বাইরে পুলিশ-বিজিবির টহল অরণ্যে রোদন ছাড়া কিছুই নয়। এ নিয়ে অনেকেই বলেছেন, ‘যে সরষে দিয়ে ভূত তাড়াবো, সে সরষেই তো ভূত’ বহুল প্রচলিত এ বাক্য বাস্তবে পরিণত হয়েছে দর্শনা রেলইর্য়াডের নিরাপত্তা, পিটিএল ও লুটেরাদের ক্ষেত্রে।

এদিকে দর্শনা রেলইয়ার্ডে অবিরাম হরিলুটের কারণে ইতোমধ্যে পুঁজি হারিয়ে ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেউলিয়া হয়ে পথে পথে ঘুরছেন দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা কলাবাগান এলাকার সাবা এন্টারপ্রাইজ, ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ, বগুড়ার হাসান ট্রেডার্স ও খলিল ট্রেডার্স। এছাড়া এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ রুটে আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। তারা রাজশাহী সোনা মসজিদ ও যশোর বেনাপোল সীমান্ত পথসহ বিভিন্ন পথে আমদানি করছেন।

রেলইয়ার্ডে লাগাতার লুটপাটের ব্যাপারে দর্শনা সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমান হাবুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইয়ার্ডের লুটপাটের মূলহোতা নিরাপত্তা ও পিটিএল বিভাগ। এ দু বিভাগের শুধু দর্শনার কর্মকর্তারাই নন, উচ্চ পর্যায়ের কর্তারাও লুটেরাদের টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন। যে কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে তারা লুটেরাদের ঠেকাচ্ছেন না। নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করছেন আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় পকেট ভরছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের দ্রুত নজর দেয়া উচিত। সচেতন মহল অভিমত ব্যক্ত করে বলেছে, এ শহরের ঐতিহ্য তথা দর্শনাবাসীর সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ের জন্য রেলইয়ার্ডের লুটপাট রুখতে হবে। গুটি কয়েক চিহ্নিত লুটেরার কারণে একদিকে যেমন দর্শনার সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি কমলে সরকার হারাচ্ছে প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব। এছাড়া লুটেরাদের মোকাবেলা না করা হলে, হয় তো এক সময় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এ রুটে আমদানি একেবারেই বন্ধ করে দেবে। তাই নিজেদের স্বার্থেই লুটেরাদের মোকাবেলা করতে সকলতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।