সংসদ বসছে আজ : সমঝোতা না হলে সংঘাত

 

স্টাফ রিপোর্টার: সংবিধান নিয়ে বিরাট বিপাকে পড়েছে সরকারি দল। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪১ বছরের মধ্যে এই প্রথম নির্বাচিত সরকারের আমলে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংঘাতের মুখোমুখি বাংলাদেশ। ২৪ জানুয়ারির মধ্যে সংসদ রেখে বা না রেখে নির্বাচন করলে বা না করলে সবক্ষেত্রেই বৈধতার প্রশ্ন উঠবে।

বিএনপি সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ঘোষণার পর তারা বিষয়টি ইতোমধ্যে খতিয়ে দেখছে এবং তারা বিদেশি কূটনীতিক বিশেষ করে জাতিসংঘকে দেখাবে যে, ১৫তম সংশোধনী কি করে বিরোধীদলের জন্য শত্রুতামূলক, কীভাবে তা পদ্ধতিগতভাবে লেভেল প্লেইং ফিল্ড সৃষ্টি করতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন সংসদ রেখে ১ নভেম্বর নির্বাচন হলে আর তাতে সরকারি দল হেরে গেলেও শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হবে না। এমনকি তিনি পদত্যাগ করলেও প্রেসিডেন্ট তাকেই বলবেন, আপনাকেই প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে হবে। আর ২৪ জানুয়ারির আগে তিনি ক্ষমতায় থেকে কেবল নির্বাচন নয়, ক্ষমতায় থেকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য সরকার গঠনেও ঘুঁটি চালতে পারবেন। পরবর্তী পরিস্থিতিতে অন্য দল থেকে ভাগিয়ে আনতে পারলে ২৪ জানুয়ারির পর তাকে শুধু সংসদের ফ্লোরে আস্থা ভোটের সম্মুখিন হতে হবে। ইসির একটি সূত্র বলেছে, সংসদ রেখে ১৫ জানুয়ারি নির্বাচন হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, সংসদ ভেঙে নির্বাচন হবে, নাকি রেখে নির্বাচন হবে, এটা নির্ধারণ করা আমাদের এখতিয়ার নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার, রাজনৈতিক দল ও আইন। বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেন, ইসির এ ব্যাখ্যা সংবিধান পরিপন্থি। কারণ সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদটির অবস্থান নির্বাচন কমিশন পরিচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদের ৩ দফার ক-উপদফা অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে উল্লেখ আছে। সংবিধানের এটি কোনো ঐচ্ছিক বিধান নয়। সংবিধান বা আইনের কোথাও উল্লেখ নেই যে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে সরকার, রাজনৈতিক দল ও আইন। সুতরাং আবু হাফিজ সংবিধানের ভুল বা একটি অপব্যাখ্যা দিয়েছেন। লক্ষণীয় যে, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে, না পরে নির্বাচন হবে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জানে না বলেও অভিমত দিয়েছেন আবু হাফিজ।

সংবিধান অনুযায়ী, এটা স্পষ্ট যে, সংসদ রেখে নির্বাচন করলেও সাংবিধানিক সঙ্কট আর না করতে চাইলেও সরকার বৈধতার সঙ্কটে পড়বে। কারণ বিদ্যমান সংবিধান একটি নির্বাচিত সরকারকে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা সাপেক্ষে ৫ বছরের মেয়াদ পূরণ করার শর্ত দিয়েছে। নির্বাচন হবে না অথচ ৫ বছরের ক্ষমতা ভোগের কোনো সুযোগ রাখেনি সংবিধান। তাই অনাস্থা ভোটে না হারলে বর্তমান সংসদ ২৪ জানুয়ারির মধ্যে কারো খেয়ালখুশিতে ভাঙা যাবে না। সংসদ রেখে নির্বাচন করলে বিরোধী দলের সম্ভাব্য সরকার গঠন বিলম্বিত কিংবা তাদের সদস্য ভাগিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এদিকে বিরোধীদল শুধু নয় মহাজোটের শরিকরাও সংসদ রেখে নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের অনেকেই লক্ষ্য করেন যে, ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে যতো বেশি দিন হাতে রেখে সংসদ নির্বাচন করা হবে ততো বেশি মাত্রায় একটি অভাবনীয় সাংবিধানিক অরাজকতা তৈরি হবে। আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাইলেই ২৪ জানুয়ারির আগে সংসদ ভেঙে দিতে পরামর্শ দিতে পারবেন না। কারণ তিনি তা দিলেও প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের পক্ষে তা গ্রহণ করার কোনো পথ খোলা নেই।

এর আগে সংসদে দাঁড়িয়ে ২৫ অক্টোবরে সংসদ ভেঙে দেয়ার ঘোষণা দিয়েও সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ রেখে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। যদিও বিবিসি সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বলেছেন, এটাই শেষ কথা নয়। তাই অনেকেই মনে করছেন, সংবিধানের ফাঁদে নিজেই পড়তে যাচ্ছে সরকারি দল। একতরফা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ২০১১ সালের জুনে ১৫তম সংশোধনী পাস করা হয়। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ইসি থেকে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিলো, সংসদ রেখে নির্বাচন করলে নানা জটিলতা, প্রশ্ন তৈরি হবে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংসদ রেখে সংসদ নির্বাচন করলে ফায়দা বেশি। তাছাড়া, ২৪ জানুয়ারির আগেই নির্বাচন করা নিরাপদ। এর আগে সংসদ ভাঙার পরামর্শ দিলে প্রেসিডেন্ট তা কোনো অনুচ্ছেদের আওতায় মানবেন সেই প্রশ্নও উঠতে পারে।

একটি সূত্র মতে, ১৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রসর হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সরকারি দল ও বিরোধী দল ব্যস্ত কৌশল নির্ধারণে। কিছুতেই সংবিধান সংশোধন করতে চায় না সরকারি দল। কারণ সংবিধানে এখন হাত দিলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি আবার সামনে আসবে। ১২ সেপ্টেম্বর ডাকা অধিবেশনটি শেষ অধিবেশন বলা হচ্ছে।

সংবিধান বলেছে, সংসদের একটি অধিবেশন থেকে পরের অধিবেশনের মাঝখানে ৬০ দিনের বেশি বিরতি হবে না। যদি ‘আগের’ ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হয়, তাহলে সংসদের অধিবেশন একটানা ৯০ দিনের বিরতিতে বসলেও চলবে। কিন্তু সংসদের বৈঠক বসতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এতটুকু খর্ব হবে না। ২৪শে জানুয়ারির আগে তিনি যেকোন দিন যেকোনো সময়ে সংসদের বৈঠক ডেকে সংবিধানের সংশোধনসহ যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পুরোপুরি সক্ষম থাকবেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৪৮ অনুচ্ছেদ নির্দিষ্ট করে বলেছে, কার্যভার গ্রহণের আগে শপথ নিতে হবে। ফলাফল গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ থেকে তিন দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। স্পিকার না পড়ালে সিইসি পড়াবেন। আর শপথ নেয়া মানেই কার্যভার গ্রহণ। কিন্তু আইনের কোথাও এটা বলা নেই যে, কতোদিনের মধ্যে ভোটের ফলাফল গেজেটে প্রকাশ করতে হবে। সুতরাং বিরোধীদলের কেউ প্রধানমন্ত্রী হলেও তার দশা মেয়রদের মতো হতে পারে।

সাংবিধানিক এই সঙ্কট প্রসঙ্গে  সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, সংবিধানের বেশ কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, প্রশ্ন উঠেছে। সরকারকে বুঝতে হবে সংবিধানে তারা পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছে বলেই সবাইকে তা মেনে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। সুপ্রিমকোর্টও দু মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কথা বলেছেন। সে মতের প্রতি আমাদের সবারই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। গণতন্ত্র মানেই আলাপ-আলোচনা। সাংবিধানিক বিধানের কারণে যেসব আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তা দূর করতে সরকারের উচিত সবার সঙ্গে সংলাপে বসা। শুধু দুই দল নয়, সকল দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং যারা সঙ্কট নিয়ে ভাবছেন তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। কারণ জাতি কোন অনিশ্চয়তা চায় না। সরকারের সাড়ে চার বছর চলে গেছে। এখন আর কোন অনিশ্চয়তা জাতি দেখতে চায় না।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধান ফৌজদারি আইন নয়। সংবিধানে যেসব বিধান রাখা হয়েছে তা রাখা হয়েছে সৎ উদ্দেশ্যে। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী যদি পদত্যাগ না করেন তাহলে সঙ্কট তৈরি হতে পারে। তবে সঙ্কট সমাধানের উপায় হচ্ছে, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। ড. মালিক বলেন, সংসদ রেখে সংসদ নির্বাচনের বিধান একটি বিশেষ পরিস্থিতির বিধান। সাধারণ পরিস্থিতিতে অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিয়ে সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত। না হয় সমতার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *