শ্রমিক নেতা খুনের পর পরিবহন মালিক-শ্রমিক বিভক্ত : ঝিনাইদহ উত্তাল

 

আসামি গ্রেফতারের দাবিতে হারতাল শেষ হতে না হতেই পৌর মেয়রকে আসামি করায় ঝিনাইদহে অনির্দিষ্টকালের হরতাল আহ্বান

ঝিনাইদহ অফিস: শ্রমিকলীগ নেতা আব্দুল গাফফার বিশ্বাসকে খুনের প্রতিবাদে ঝিনাইদহে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। গতকালের হরতাল শেষ হতে না হতেই অনির্দিষ্টকালের হরতাল আহ্বায়ন করেছে ঝিনাইদহ বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি, দোকান মালিক সমিতি, ঝিনাইদহ পৌর কর্মচারী শ্রমিক ইউনিয়ন ও জেলা আওয়ামীলীগের একাংশ। গাফফার হত্যামামলার আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে গতকাল ঝিনাইদহে হরতাল পালিত হয়। আর আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের হরতাল শুরু হচ্ছে ওই হত্যামামলায় ঝিনাইদ পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুকে আসামি করায়। এছাড়া ঘটনার দিন অর্থাত গত পরশু থেকে ঝিনাইদহ জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকে ডাকে পরিবহন ধর্মঘটে অব্যাহত রয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তি পড়েন।

ঝিনাইদহ বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফ্ফারকে খুনের প্রতিবাদে ও আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে গতকালের হরতাল ও পরিবহন ধর্মঘটে ঝিনাইদহের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ঝিনাইদহ শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরপাল্লার ও অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো বাস ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ইজিবাইক চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা শহরের দোকানপাটও বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া জেলার বিভিন্ন মহাসড়কে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পিকেটিং করছে। হরতাল ও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে ঝিনাইদহের সাথে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও ঢাকাসহ সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো। এদিকে কোনো যানবাহন চলাচল না করায় সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। দু দিন ধরে যানবাহন না চলায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শহরের আরাপপুর, হামদহ, টার্মিনাল, বাইপাসসহ বিভিন্ন সড়কে শ্রমিকরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করে রাখে। শ্রমিকরা শহরে খণ্ড খণ্ড মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। তারা অবিলম্বে গাফফার হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। গাফফার হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে শহরের আরাপপুর বাসস্ট্যান্ডে জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। সমাবেশে বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু বলেন, ( তিনি মামলার আসামি) গাফফারের স্ত্রী ঠিকাদারি কাজের বিরোধ নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন তা সত্য নয়। একজন শ্রমিক কীভাবে ঠিকাদারি কাজ করবে। ঝিনাইদহ পৌর বাস টার্মিনালে পরিবহন কাউন্টার বরাদ্দের সময় গাফফারকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। সেসময় টার্মিনালে শ্রমিক ইউনিয়নের অফিস থাকা ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে অর্থ আত্মসাতের দায়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল বিশ্বাস বহিষ্কার করেন গাফফারকে। গাফফারও পাল্টা বহিষ্কার করে উজ্জ্বল বিশ্বাসকে। শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জ্বল বিশ্বাস এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মেয়র মিন্টু আরও বলেন, গাফফারকে যারাই হত্যা করুক তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একটি চক্র শ্রমিক ও মালিকদের এক্য বিনষ্ট এবং শ্রমিক ইউনিয়ন দখলের পাঁয়তারা করছে। এদিকে গাফফার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অপ্রীতিকর যেকোনো ঘটনা এড়াতে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে হাফিজ ও বাদশা নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। ঝিনাইদহের সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে কয়েকদফা বৈঠক করা হয়েছে। হত্যাকারীদের যেই হোক না কেন তাকে গ্রেফতার করা হবে।

এদিকে ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুর বিরুদ্ধে শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল গাফফার বিশ্বাস হত্যামামলা দায়ের হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা নতুন রূপ নেয়।সাথে সাথে ঝিনাইদহে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য হরতাল আহ্বান করা হয়। ঝিনাইদহ বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি, দোকান মালিক সমিতি, ঝিনাইদহ পৌর কর্মচারী শ্রমিক ইউনিয়ন ও জেলা আওয়ামীলীগের একাংশ এ হরতাল আহ্বান করে। হরতালের সমর্থনে মঙ্গলবার রাতে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামীলীগের একাংশ ঝিনাইদহ শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। মিছিলকারীরা সাইদুল করিম মিন্টুর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দেয়। এ সময় শহরে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়।

মঙ্গলবার বিকেলে নিহত শ্রমিক নেতা গাফফারের ছোট ভাই রেজাউল ইসলাম বিশ্বাস বাদী হয়ে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু, ঝিনাইদহ বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি রোকনুজ্জামান রানুসহ ১৮ জনকে আসামি করে ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন-হাবিবুর রহমান রিজু, বল সাইদ, সুমন ব্যানা, ওলিয়ার রহমান, বজলুর রহমান, মহব্বত আলী, সুমন ওরফে মফিজ, নিকারি সাইফুল, মাছ সাঈদ, কুড়াল বাবলু, লম্বা বাবলু, কাঙ্গালে হায়দার, হাতি মনিরুল, আজিজ মণ্ডল, আব্দুল মালেক ও রাশেদ।

প্রসঙ্গত, সোমবার ঝিনাইদহ শহরের আরাপুর উকিলপাড়ায় ঝিনাইদ জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গাফফার বিশ্বাসকে খুন করা হয়। বাদী তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, আমার ভাই ইউনিয়নের দায়িত্বপালনকালে ঝিনাইদহ জেলা বাস টার্মিনালে ২৮ লাখ টাকা খরচ দোকান ও বাস কাউন্টার নির্মাণ করে। কিন্তু প্রথা বহির্ভূতভাবে বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সম্পাদক পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু জোরপূর্বক ওই নির্মিত দোকান বিভিন্ন লোকের নিকট অগ্রিম ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেন। অথচ আমার ভাইয়ের পাওনা ২৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেন না। এ ঘটনা নিয়েই তার সাইদুল করিম মিন্টুর সাথে দ্বন্দ শুরু হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *