শিশু হুসনার জবানবন্দি ২২ ধারায় রেকর্ড : মামলার এজাহার হাজারীবাগ থানায় প্রেরণ

0
35

 

ডা. রত্না ও তার স্বামী প্রকৌশলী রেজাউল জেলহাজতে

 

স্টাফ রিপোর্টার: গৃহপরিচারিকা শিশু আসমাউল হুসনাকে নির্যাতনকারী ডা. রত্না ও স্বামী প্রকৌশলী রেজাউলকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে তাদেরকে আদালতে হাজির করে জামিনের আবেদন করা হয়। আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। এদিকে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় দায়ের করা মামলাটি রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় পাঠানো হয়েছে। অপরদিকে নির্যাতিত শিশু হুসনার জবানবন্দি ২২ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। খুব শিগগিরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা করা হবে বলে বাদী পক্ষের আইনজীবীসূত্র জানিয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ২টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ অভিযুক্ত নির্যাতনকারী ডা. জান্নাতুল বাকী জান্নাত রত্না ও তার স্বামী প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমকে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত চুয়াডাঙ্গা ক সদর অঞ্চলে সোপর্দ করে। সেখানে আসামি পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দেন। বেলা সোয়া ২টার দিকে নির্যাতিত শিশু আসমাউল হুসনা আসমা ওরফে হুসনার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় দেয়া এ জবানবন্দি রেকর্ড করেন বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শেখ আমীনুল ইসলাম।

পুলিশ জানায়, নির্যাতিত শিশু হুসনার মা শিল্পী খাতুনের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ৪ (২)/৩০ ধারায় দায়ের করা মামলাটি বৃহস্পতিবার সকালেই ঘটনাস্থল রাজধানীর হাজারীবাগ থানা ডিএমপি পুলিশের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আতিকুল ইসলাম জানান, হাজারীবাগ থানার মামলায় ডা. রত্না ও তার স্বামী প্রকৌশলী রেজাউল করিমকে শিগগিরই শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হতে পারে। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাড. মানি খন্দকার জানান, হাজারীবাগ থানার মামলায় আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হলে আপাতত তাদের জামিনের সম্ভাবনা নেই।

সূত্র জানায়, চুয়াডাঙ্গা রেলপাড়ার প্রফেসর শমসের আলীর মেয়ে ডা. জান্নাতুল বাকী জান্নাত রত্না ঢাকার ধানমণ্ডিতে ভাড়ার বাসায় বসবাস করেন। বছরখানেক আগে তার শিশুসন্তানকে দেখভালের জন্য গৃহপরিচারিকা হিসেব চুয়াডাঙ্গা বিএডিসির শ্রমিক শহিদুল ইসলামের মেয়ে আসমাউল হুসনাকে (৯) নিয়ে যান তিনি। শহিদুল ইসলামের বাড়ি জীবননগর উপজেলার সুবোলপুরে হলেও চুয়াডাঙ্গা রেলবাজার আরামপাড়ার ভাড়ার বাড়িতে বসবাস করেন। ঢাকায় নেয়ার কিছুদিনের মাথায় শিশু হুসনার ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। কারণে অকারণে ডা. রত্না তার ওপরে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন করেন। শরীরে ছ্যাঁকা দেয়া হতো গরম খুন্তি বা চামচের। এরই মধ্যে প্রায় এক বছর কেটে যায়। কিন্তু মেয়ের সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করতে পারেন না আসমাউল হুসনার পিতা-মাতা। এরই মধ্যে সে অসুস্থ হয়ে মানুষিক ভারসাম্য হারানোর উপক্রম হয়। এ পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে তাকে চুয়াডাঙ্গায় নিয়ে তার পিতা-মাতার হাতে তুলে দেয়া হয়। কিন্তু মেয়ের চেহারা আর সারা শরীরজুড়ে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে হতবাক হয়ে যান হুসনার মা-বাবা।

মানবতা সংস্থার উদ্যোগে গতকাল বৃহস্পতিবার অসুস্থ শিশু হুসনাকে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান মালিক খোকনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক খোকন জানান, হুসনা শারীরিক দিক দিয়েই শুধু নয়, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তার মানিসক চিকিৎসারও প্রয়োজন। মানবতা সংস্থা এ সময় হুসনার প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য কিনে দেয়।

শিশু হুসনা এখনো আতঙ্কিত হয়ে আছে। সে নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে গতকাল আরো বলেছে, ডা. রত্না তাকে কথায় কথায় মারধর করতেন। কাজ সেরে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত ১টা বাজতো। আবার ভোর ৫টায় উঠতে হতো। ঘুম থেকে জাগতে দেরি হলে ডা. রত্না তার চোখে আঙুলের আঘাত করে ঘুম ভাঙাতেন। সামান্য ভুল হলেই দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিতেন। এতে কয়েকদিন মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। গত ছয়মাস নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। একদিন জ্বলন্ত চুলার সাথে হুসনার হাত ঠেসে ধরেন ডা. রত্না। গরম খুন্তি আর গরম চামচ দিয়ে হুসনার সমস্ত শরীর ঝলসে দিয়েছেন তিনি। কোনো কোনো দিন বুকে পিঠে লাথি মেরে ফেলে দিতেন। সপ্তা দুয়েক আগে গরম কড়াই চেপে ধরে হুসনার নিতম্বদেশে (পাছা)। এ ছাড়া শরীরের কোথাও কোথাও ছোটখাটো ছ্যাঁকা দেয়া চললো। এরই ফাঁকে ৫ম তলার এক মহিলার কাছে নির্যাতনের ঘটনা বলে নিজে বাঁচতে চায় হুসনা। পরে অবস্থা বেগতিক বুঝে হুসনাকে চুয়াডাঙ্গায় রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ডা. রত্না।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাড. মানি খন্দকার জানান, বিভিন্নভাবে মামলার বাদী শিল্পী খাতুনকে হুমকিধামকি দেয়া হচ্ছে। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শিগগিরই থানায় আরেকটি মামলা করে শ্যোন অ্যারেস্টের জন্য আবেদন করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here